Monday, April 14, 2008

একটি গোলাপের আদর

: হ্যালো...
তুই অনেক ঘুম জড়ানো কন্ঠে ওপাশ থেকে বললি।

: ঘুমাচ্ছিস বুঝি!
: ছুটির দিন, ভোর বেলা লোকজন তো ঘুমাবেই নাকি?
: তা ঘুমাবে যদি না আমার মতো কেউ হঠাৎ ফোন করনে ওয়ালা না থাকে।
: হুমমম
: যদি বলতে পারিস কেনো ফোন করেছি তাহলে তোকে ইউরেনাস গ্রহটা লিখে দিয়ে দেবো!
: এতো বড় গ্রহ নিয়ে আমি কী করবো! রাখবো কই!
: আচ্ছা তাহলে যা, তোকে শনি গ্রহের একটা বলয় লিখে দেবো।
: হে, ওখানে বসে বসে কি পা ঝুলাবো আমি? লাগবে না আমার।
: আরে ভেবে দেখ, একেবারে ৫০০ টাকার স্ট্যাম্পে দস্তখত দিয়ে লিখে দেবো, ঈমানে কই।
: তুই কি পুরা সৌরজগতের লীজ নিলি নাকি?
: আরে তুই একবার বলে তো দেখ, তোকে গোটা ছায়াপথটাই ঘুরিয়ে নিয়ে আসবো ধূমকেতুর ল্যাজে চড়িয়ে।
: হইছে থাম থাম। পরে পিছলা খাইয়া পড়ুম।

আমার আজকে কী হলো, রাজ্যের ক্ষুধা পেয়ে বসলো। ক্ষুধায় আমার কথা জড়িয়ে এলো। ঘুমজড়ানো গলায় তোর কথা বুঝি না, ক্ষুধায় চোটে নিজের গলায় কথা সরে না।

: পেটে আমার জ্বলন্ত ক্ষুধা, বুকে আমার খাওয়ার তীব্র আকাঙ্খা। কী যে করি!
: ক্ষুধা লাগলে খা। ঘরে কিছু নাই?
: আছে তো, কিন্তু আমার যে ঢেঁড়স ভাজি দিয়ে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত খেতে ইচ্ছে করছে কাগজি লেবু চটকিয়ে।
: ঈশ, ঢেঁড়স জিনিষটা আমার একদম পছন্দ না আর এটার কথাই বললি!
: তোকে শিখিয়ে দিই কীভাবে ঢেঁরষ ভাজতে হয়। প্রথমে একটা কড়াইয়ে তেল গরমল করবি...
: আমি জানি কীভাবে ঢেঁড়স ভাজি করতে হয়।
: ওহ্, তাও জানিস! কিন্তু আমার খেতে ইচ্ছে করছে যে।
: এক কাজ কর। তুই তোর পরিকল্পনা মতো হালচাষ শুরু করে দে। তখন দেখবি কেউ গামছায় বেঁধে তোর জন্য ধোঁয়া ওঠা ভাত আর ঢেঁড়স ভাজি নিয়ে আসছে। তুই সেগুলো ক্ষেতের আলে বসে বসে খাবি।
: মশকরা করস? ক্ষুধার্তের সঙ্গে মশকরা করা কিন্তু ঠিক না। ক্ষুধা বেরাজি হয়।
: মশকরা কই করলাম। হাজার মাইল দূরে তোর জন্য ঢেঁড়স ভাজি করে কে নিয়ে যাবে? এক কাজ কর, বেরিয়ে যা ঘর থেকে।
: বের করে দিচ্ছিস?
: আরে, বের করে দিচ্ছি না বেকুব। বলছি বাজারে যা, ঢেঁড়স কিনে নিয়ে আয়।
: কোথায় যাবো, কারওয়ান বাজার নাকি দক্ষিনখান?
: থাক যাওয়া লাগবে না, বসে থাক।

তুই বললি আমি নাকি আজ স্বপ্নে ঢেঁড়স দেখবো। আস্ত জলজ্যান্ত, নিরীহ মুখের একটা ঢেঁড়স, তার দিকে আমি ছুরি উঁচিয়ে যাচ্ছি। ঢেঁড়সটা ভয় পেয়ে ছুটে যাচ্ছে, আমি পেছন পেছন দৌড়াচ্ছি। তুই এই সব কথা কোত্থেকে বলিস কে জানে। আমার দারুণ লাগে, ভালোলাগে। নইলে ক্ষুধা পেটে আমি এতো মিষ্টি মিষ্টি করে কথা বলি!

: চোখ বন্ধ করে আছিস এখনো?
: তুই কি দেখতে পাচ্ছিস!
: নাহ্, তা পাচ্ছি না।
: তো বলছিস যে!
: চোখ খোল।
: মাথা ব্যাথা করবে যে!
: করলে করবে, চোখ খোল তোকে একটা কথা বলবো।
: নে খুললাম, এবার বল।
: উঠে বস।
: উফ, আবার বসতে হবে কেনো!
: আহা, বোস ই না।

তোর ঘুম জড়ানো কন্ঠ গলে কী বের হলো, কিছুই বুঝলাম না।

: হুমম, তুই খালি ঝামেলা করিস।
: হাহাহা
: আমার ঘুম পুরো হয়নি। মিনিমাম আরও ঘন্টা তিনেকের কোর্স।
: হুমম, বসেছিস, চোখ খোলা?
: হ্যাঁ তো...
: শুভ নববর্ষ
: হাহাহা... পারিসও তুই। তোকেও অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

: তুই আমার জন্য একটা কাজ করবি? এটা একটা প্লিজ!
: হুমম, বল।
: করবি তো!
: আহা, বল ই না। বললাম তো রে বাবা করবো।
: তুই কখনো খুব সকালে ঘুম থেকে উঠিস?
: উঠি তো মাঝে মাঝে।
: হুমম। আমার জন্য একদিন উঠবি। অনেক সকালে। সূর্য ওঠার আগে। উঠে ছাদে যাবি। আচ্ছা তোদের ছাদে যাওয়া যায়?
: হ্যাঁ, যায়। কিন্তু এতো সকালে ছাদ তালা দেয়া থাকে যে!
: চাবি নিয়ে রাখবি কোনো একদিন। পারবি না।
: হুমম পারবো।
: ছাদে গিয়ে কী করবি?
: তালা খুলবো, তারপর লাগিয়ে এসে আবার ঘুমিয়ে পড়বো!
: তোরে কি আমি তালা খোলা আর লাগানোর জন্য এই ভোর বেলা উঠতে বলছি?
: তো কী করবো, বলিসনিতো!
: হুমম। ঘুম থেকে উঠে চোখে মুখে পানি দিবি। একটু শীত শীত লাগলে ওড়নাটা চাদরের মতো করে জড়িয়ে নিবি। তারপর ছাদে যাবি। রেলিঙ ধরে দাঁড়াবি সূর্যোদয়ের আগে। তোর চোখের সামনে দিয়ে সূর্য উঠবে। তখনকার তোর একটা স্কেচ করে আমাকে দিবি, পারবি না!
: আমি কি আঁকতে পারি নাকি। স্কেচ করবো কী করে!
: আরে, স্কেচ কেবল পেন্সিলেই হতে হবে কেনো। বাক্যের গঠনেও তো হতে পারে। তুই সেটাই করবি। আমি দেখবো তোকে, ভোরের তোকে কেমন লাগে।
: কেমন লাগবে আমি জানি। ঘুমে চোখ ফোলা ফোলা, চুল খাড়া হয়ে থাকবে। আচ্ছা, বারান্দায় হলে হয় না?
: নাহ্, কেনো!
: আমাদের ছাদটানা খুব খারাপ। রেলিং খুব নিচু। ঘুমের ঘোরে যদি পড়ে যাই। তখন স্কেচ আঁকা বাদ দিয়ে তো জীবনের হালখাতা করতে হবে!
: হুমম, চিন্তার কথা। একটা কাজ করা যায়। ছাদে উঠেই মোটা একটা রশি নিয়ে কোমড়ে বেঁধে তার আরেক মাথা স্টেবল কোনো কিছুতে বেঁধে রাখতে পারিস। তাহলে পড়ে গেলেও ঝুলে থাকবি।
: হে, মাংকি জাম্পের মতো! আমার অনেক ভালো লাগে মাংকি জাম্প। দিতে না, দেখতে। লোকজন আআআ করে চিৎকার করতে থাকে।
: নেপালে করা যায় মনে হয়।
: তাই নাকি!
: তবে তোর সুবিধা হবে না। তুই কইলজ্যা ফাইট্যা মরে যাবি। আআআ করে চিৎকার দিয়েই তুই শেষ।
: হাহাহা, তা ঠিক।

তোকে, তোর শুভ্রতাকে ভোরের আলোর কুমারী শুভ্রতায় উপলব্ধি করার প্রবল বাসনা আমার। কোনোদিন হয়তো এই সময়টায় তোকে সামনে থেকে দেখা হবে না আমার। কপালের দোষ দেবো তোর মতো!

: তোকে একটা কথা বলতে চাই, বলবো!
: হুমমম
: না থাক, বলবো না।
: আমি শুনবো, বল।
: আমি আসলে বুঝতে পারছি না, বলাটা ঠিক হবে কীনা।
: হবে, বল।
: নারে, থাকুক কথাটা না বলাই।
: অর্ধেক কথা বলে! আর বলতে বলবো না। তুই তখন প্যাচাবি।
: থাক, বলিস না আর।

ভারী হয়ে যাওয়া আলাপ একটু হালকা করতে চাই। সিরিয়াস কোনো আলাপের সময় আমার মুখে কুলুপ এঁটে যায়, মেপে মেপে কথা বের হয়। তোর ও কি এমনটা হয়?

: তোকে আবহাওয়ার একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিই!
: হুমম
: সকালে যখন ঘুম ভাঙলো তখন ঝলমলে রোদ। তারপর দুপুরের দিকে মন খারাপ করে দিলো আকাশ। একটু কাঁদলোও বোধহয়। বিকেলের একটু আগে আবার হাসি ফোটালো ঠোঁটে। কিন্তু বিকেলে গড়িয়ে সন্ধ্যায় আবার সেই মন খারাপ করা রূপ। বৃষ্টি না হলেও ভ্যাপসা একটা পরিস্থিতি। আর এখন, গুড়িগুড়ি ঝরছে। এখন বৃষ্টির পানি বেয়ে পড়া দেখি।
: পানি পড়া দিবি নাকি?
: কেনো, তুই দিবি?
: নাহ্, ঐটা তোরই কাজ। তুই ই দে।
: হাহাহা, তোর মনে আছে!
: হুমম, হাহাহা। আচ্ছা তুই কি বাইরে!
: হুমম
: বাইরে কী করিস!
: গাছ খুঁজি। তোকে শুভেচ্ছা জানালাম শোয়া থেকে বসিয়ে। এখন আমি গাছে চড়বো, আর তুই আমাকে শুভেচ্ছা জানাবি। হাহাহা
: হাহাহা

দুজনেই হেসে উঠি। একেবারে অকারণ, গুরুত্বহীন এবং নির্ভেজাল একটা হাসি। তোর হাসি চলতে চলতেই ভাবি একটা ধাক্কা দিই তোকে-

: আচ্ছা তুই আমার বউ হবি?
: তোর মতো পাগলের বউ হবার কোনো ইচ্ছা আমার নাই।
: তোরে কোন হালা বিয়ে করবে শুনি?
: আরে করবে করবে। খুব শীঘ্রই আমার বিবাহ হবে।
: ঐ হালার ঠ্যাং ভাংবো দাড়া।
: না না, ঠ্যাং ভাঙিস না। বেচারা অনেক ভালো মানুষ হবে রে!
: তাইলে তোরে বিয়ে করতে আসে কেনো!
: তো তুই কি চাস, কোনো খারাপ মানুষ আমাকে বিয়ে করুক!
: আমি তো চাই তোর বিয়েই না হোক। হাহাহা
: হ, তোর তো যতো খারাপ বুদ্ধি!

আলাপটা এর চেয়ে বেশিদূর যাবার দরকার নেই বোধহয়। তুই অনেক বুদ্ধিমতি...। আর আমারতো পায়ে বোম মেরেও এর চেয়ে সামনে আগানো যাবে না।

: আচ্ছা শোন। তুই ঘুমা আবার। অনেক সময় নিলাম তোর।
: হুমম। কতোক্ষণ নিলি, ক'টা বাজে এখন।
: সাড়ে আটটা।
: হুমম, দেড় ঘন্টার মতো।
: উঠে কী করবি!
: আরও ধর ঘন্টা খানেক ঘুমাবো। আমি এখনো চোখ খুলতে পারছি না। উঠে ঘর গোছাবো। টুকটুক যা কাজ আছে করে ফেলবো। বিকেলে হয়তো বেরুবো। তোর কাজ আছে না আজ!
: নাহ্, আজকে সারা বিশ্বজগতে সরকারী ছুটি, তুই ঘর গোছাবি যে!
: হাহাহা
: রাখি রে।
: শোন--- শুভনববর্ষ
: হুমম, তোকেও।
- এবং অটো ডিসকানেক্ট!

তোর সঙ্গে কথা শেষ হবার পরে পুরো ফিল্ম স্ট্রিপের মতো করে সামনে দিয়ে চলে গেলো একেকটা দিন-ক্ষণ-মুহূর্ত। তুই বলিস ইমোশনাল আমি বলি এসকেপিস্ট। তুই জানিস আমি হারতে পছন্দ করিনা। আমি প্রয়োজনে নিজেকে কলয়ডাল অবস্থায় নিয়ে যাই চাপতে চাপতে। অন্য কোনো অধ্যায় শুরু করে দিই, সবার অন্তরালে। সবাই ভাবে, এটাই সত্যি, তুইও কি তাই ভাবিস?

তোকে প্রথম যখন দেখেছিলাম, হেমন্তের দুপুরে, সন্ধ্যায় কার্ডিগান গায়ে, ভালো লেগে গিয়েছিলো তোকে। তখনও জানতাম না তোর ব্যাপারে। যেদিন জানলাম, তোর মন অন্যকারো সঙ্গে বাঁধা, তোর কসম করে বলছি- ভয়ানক কষ্ট পেয়েছি আমি। কখনো কি কাউকে কিংবা তোকে বুঝতে দিয়েছি? দেইনি। কিংবা তুই বুঝিসনি।

সবার চোখে ধূলো দিতে, এমন একটা কিছু করলাম- তুই নিজেও গোল পাকিয়ে ফেলেছিলি, বোধহয়। তুই কি কখনো খেয়াল করতিস তোর সঙ্গে কথা বলতে আমার ভালো লাগতো সবচেয়ে বেশি। গালের কোনে কিংবা কানের লতিতে সামান্য রক্তিম আভাও হয়তো ছড়িয়ে পড়তো সন্তর্পনে, খেয়াল করতি কি? সামান্য একটু সুযোগ খুঁজতাম শুধু তোর সাথে কয়েকটা সেকেন্ড সময় কাটানোর জন্য। তুই বুঝিসনি কিছুই, না!

তোদের সম্পর্কটা যখন ভেঙে যাচ্ছিলো, সবচেয়ে বেশি কনসার্ণ কি আমি দেখাইনি? কী করবো বল। আমি যে এরকমই। তোর সাথে পরিচয়ের আগে বা পরে, যখনই খুব কাছের কিংবা প্রিয় মানুষের ক্ষেত্রে এমনটা হয়েছে, আমি নিজে চেষ্টা করেছি, বুঝিয়েছি সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার জন্য। তুই প্রমাণ চাস, দিতে পারবো! কিন্তু কেনো এমন করছি, তা কি তুই তখন কিছুই আঁচ করতে পারিসনি, নাকি করতে চাসনি!

তুই, আমি, আমরা সবাই বড় হয়ে গেছিরে অনেক। অনেক গুলো দিন-মাস-বছর পেছনে ফেলে রেখে এসেছি। সময়ের সাথে সাথে আমরাও একটু একটু করে বিদগ্ধ হয়ে উঠেছি কিংবা উঠছি। সবদিক ভাবতে শিখেছি, তুই শিখেছিস। অংকে ভালো ছিলি, হিসাবেও তাই কাঁচা নস। মন কিংবা ইমোশন বাদ দিয়ে তুই হিসাব করতে পারিস, কর্পোরেট রোবট হয়েই গেলি তবে। আর আমি দিনমান রোবটদের সঙ্গে কাটিয়েও রোবটের মতো হতে পারলাম নারে। আফসোসটা রয়েই গেলো। তুই ভালো থাকিসতো! অনেক ভালো, যতোটা ভালো থাকলে তুই ঝলমলে আলোর মতো না, বরং ঝুমাঝুম বৃষ্টির মতো সারাক্ষণ হাসতে পারিস। আমি তোর সেই হাসি শুনবো কান পেতে, উপলব্ধি করবো হৃদয় দিয়ে।
"মোর হিয়া যে বাঁধিনো তোমারই হিয়ার সনে"- কতদূর যাবি বলতো! পরকীয়া করবো তোর সাথে। কি, করবি না!

2 comments:

OLED said...

Hello. This post is likeable, and your blog is very interesting, congratulations :-). I will add in my blogroll =). If possible gives a last there on my blog, it is about the OLED, I hope you enjoy. The address is http://oled-brasil.blogspot.com. A hug.

toxoid_toxaemia said...

ধুগো দাদা, উপরের মন্তব্যটি মনেহয় শুধুই স্প্যাম।যাই হোক,লেখাটি পড়লাম।মনটা যেন একটু খারাপ হয়ে গেল।আচ্ছা,কাউকে ভালবাসলে কি বলে দেয়াটাই শ্রেয় নয় ???