Thursday, April 10, 2008

গুরুচন্ডালী - ০০৫

ঘরে ঢুকে পিসি'র দিকে তাকাতেই দেখি এভিজি তার ছেলেপুলে, নাতিপুতি সহ আমার পেয়ারের ডেলের ওপর খবরদারী করছে। কপাট ভেঙে তার প্রতিটা ঘরে ঘরে হানা দিচ্ছে কী সব আবোল তাবোল সন্দেহজনক হামলাকারীর খোঁজে। পাশে তাকিয়ে দেখি দাঁত কেলিয়ে বিজয়ীর হাসি হাসছে হুকুমের আসামী, এক্ষেত্রে স্বরাস্ট্রমন্ত্রী আমারি স্বনামধন্য ছোট ভাই। ওর হাসি দেখেই আমার ভেতরটা মোচর দিয়ে উঠলো! বুঝলাম ঘটনা খারাপ, শুধু খারাপই না- বেজায় খারাপ।

হাজার চারেক সন্দেহজনক হামলাকারী খুঁজে বের করে দিয়ে যখন এভিজি সাহেব বিদেয় নিলেন, তখন ডাক পড়লো আমার। কারণটা আগেই আন্দাজ করা ছিলো। বেচারা কম্পু স্টার্ট হতে নাকি অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। ঘুরে ফিরে খালি ওয়েলকাম স্ক্রীণে চলে যায়। আমি অবশ্য আমার ডাক পড়ার আগেই হাতুরি-বাঁটাল নিয়ে রেডি হয়ে ছিলাম। ডাক পড়াটা কেবল সময়ের দাবী ছিলো মাত্র! ঘটনা নতুন না তো। এই যেমন নয়া নতুন সনি'র পি-টু হান্ড্রেড কিনে দেয়ার মাস খানেকের মধ্যে ফ্ল্যাশ গন। তারও আগে আমার স্বাধের তোশিবা স্যাটেলাইট সিরিজের কপালেও ভালো কিছু জোটেনি, পিলিপস এমপিথ্রি প্লেয়ার, গেলো তার কন্ট্রোল নষ্ট হয়ে, একটা ডেস্কটপ পড়ে আছে টেবিলের কোণায়, এগুলো অবশ্য কোনোটাই বেচারা ছোটভাইয়ের দোষ না। জিনিষ গুলোই হঠাৎ মানুষের মতো আচরণ করে বিগড়ে বসলো। সেই ধারাবাহিকতায় এই ব্যাটা ডেল ইন্সপাইরন যে গত কয়েকটা মাস কী করে সার্ভাইভ করলো সেটাই অষ্টম আশ্চর্য আমার কাছে।

রাতে ঘরে ফিরে চালিয়ে দিলাম এক্সপি। উদ্দেশ্য এভিজি মিয়া যা যা সাফা করে দিয়েছে, সেই চোর ছেচ্চরগুলোকে লাল কার্পেট সম্বর্ধণা দিয়ে ফেরৎ আনা। দুই নাম্বার উইন্ডোজে এক নাম্বার লেটেস্ট ব্রাউজার আর মিডিয়া প্লেয়ার ব্যবহার করতে গিয়ে অনেক কিছুই করতে হয়েছে দারোয়ানের চোখ ফাঁকি দিয়ে। যাইহোক, ভাগ্য অতীব সুপ্রসন্ন হলে নাকি অতলান্তিকেও চর দেখা দেয়। আমার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো না। ঊনচল্লিশ মিনিট রিমেইনিং নামক সাইনবোর্ডটা দীর্ঘ দু'ঘন্টা ধরে মনিটর জুড়ে ঝুলানো দেখে বুঝলাম কাজ হবে না। এরে ধরি, ও ভাই তোমার এক্সপি আছে? উত্তর আসে, পিসিই নাই- এক্সপি দিয়া কী করুম? আরেকজনরে জিজ্ঞেস করি, ভাব নিয়ে উত্তর দেয় ভিসতা ইউজ করি! আমি পড়লাম না মহা গ্যাড়াকলে!

অবশেষে, ৩২ বিটের প্রসেসর আর ৫১২ র‌‌্যাম নিয়ে একটা রিস্ক নিয়েই ফেললাম। দিলাম ভিসতার হোম এডিশন ঢুকিয়ে শালার ভেতরে। এই ভিসতা যোগার হলো এখ বিরাট ইতিহাস নিয়ে। সংক্ষেপে বলে রাখি, পুরা ফাঁকতালে পাইছি, তাও জেনুইন। একেবারে সাইনবোর্ড টানানো।

এখন, পিসিতো দুইদিন পর স্টার্ট করা গেলো কিন্তু নেটে আর ঢুকা যায় না। ঐ দিকে সাদাত অমিত তারেক লাঠি নিয়ে স্বপ্নে তাড়া করে! ডরের চোটে না ঘুমিয়ে রাত কাটাই। নেটে যাওয়াটা ফরযে ক্বেফায়া হয়ে দাড়ায়। এক্সপি'র নেটগীয়ার ভিসতায় কাজ করে না। যাদের নেট ব্যবহার করি, শালারা চৌদ্দটা থেকে বিশটা পর্যন্ত দপ্তর খোলা রাখে। চৌদ্দটা বাজতে বাজতে আমার নিজের ধৈর্য্য ঘড়ির ব্যাটারী শেষ হওয়ার পথে। সলুশন পেলাম, আমার ইমেইল একটা লিংক পাঠানো হলো। সেখান থেকে ড্রাইভার ইনস্টল করে নিলেই হলো। আমি হাসলাম। যে আমি গত আড়াই দিন ধরে নেট সেবা পাইনা তার কাছে পাঠানো হয়েছে ইমেইল, 'ব্যাটা ইতর কোথাকার'। ইতর কথাটার মানে না বুঝে ব্যাটা বলে, "ভি বিটে!" আমি বলি কিছু না, ডাংকে।

কিচেনে গিয়ে আমার সিগারেট মেইট চান্দুকে জিজ্ঞেস করলাম নেট আছে কী না। কয় কাজ করে না। সুন্দরী আনিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম খালি মেইল চেক করবো! ছেমরি কয়, "জেয়ার টয়ার!" আমি কই, যা ফোট, মুড়ি খাগা গিয়া!

ড্রাইভার ইনস্টলড হলো। শত্তুরের মুখে পুরা ছাইয়ের স্তুপ ছড়িয়ে দিয়ে আমার নেট আবার আগের অবস্থানে ফিরে এলো। কিন্তু ঝামেলা বাধালো বত্রিশ বিট। একটা ব্রাউজার খুললেই হার্ডড্রাইভের বাতি আর নিভে না। ভাবে মনে হয় এই ব্যাটা টুয়েন্টিফোর-সেভেন সার্ভিস দেবার জন্য জানপ্রাণ! কী আর করা, এক ক্লিক করে আধা ঘন্টার একটা ঘুম দিয়ে উঠে তারপর ক্লিকের ফলাফল দেখতে পারি। মন্দ না। যাত্রা দেখার সাথে কলা বেঁচাও হয়ে যাচ্ছে আমার।

আমার স্কুল বেলায় সারাংশ লিখনে ফাঁকিবাজি এখন টেরপাই হাতেনাতে। পিসি খারাপ হইলো, এই ঘটনা লিখতে গিয়ে পুরা এক মহাকাব্য লিখে ফেললাম। এখন আমি সেই ঘটনাটা লেখি কেমনে? আরে ঐ যে সেদিন ট্রেনে কানে মোবাইলের তার ঠেসে ধরে গান শুনছিলাম যে। তারপর যে একটা কল এলো, আমার মোবাইলে সারাক্ষণই বীপ করা থাকে। সাধারণত কেউ বুঝেনা আমার কল এসেছে। এবারো তাই হলো। আমি বাইরের কন্ট্রোল থেকে রিসিভ করে কথা বলছি। ঠিক সামনে বসেছিলো দজন শুলারিন। একজন আবার দেখতে সেইরম। (আমি যে কেন শুলার হৈলাম না, আফসোস লাগে ) আমি যখন কথা শুরু করলাম ফোনে, সেইরম চেহারাধারী শুলারিন ললনার চোখের সঙ্গে টু টাইমস নাইনটি ডিগ্রী এঙ্গেল। ললনা আমাকে জিজ্ঞেস করে তাকে কিছু বলছি কিনা। আমি কোনো শব্দ না করে, তার দিকে তাকিয়ে ফোনে কথা চালিয়ে যাই। মেয়েটা জবাব দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ভাষাগত অর্থোদ্ধারে ব্যর্থ হয়ে ক্ষ্যান্ত দেয়। এবার আমি আস্তে করে মাথা ঝাঁকিয়ে ঠোঁট নেড়ে বুঝাই তোমাকে না, মোবাইলে কথা বলি। মেয়েটা হাসিতে ভেঙে পড়ে, মদন হওয়ার আনন্দে। দুজনেই হাসে। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। ফোনে কথা শেষ করে, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আমিও হাসি। ওদের মতো না। আমার মতো। তা দেখে তারাও হাসে। আমি খুশী হই। যাত্রা ভালো লাগে। কিন্তু সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। নেমে যায় সুন্দর সেই ললনা। আমি আবারও বিষাদে ডুবে যাই। নীল নয়নার ফাঁদে অল্পের জন্য পড়া হলোনা বলে আফসোস হয় বাকিটা পথ!

Thursday, April 03, 2008

আজ মন খারাপ করা দিন

আসাম ব্লেণ্ডের টি-ব্যাগ, ওয়াটার কুকারে টগবগ করে ফুটতে থাকা পানি, পাশে কি জানি একটা বিদঘুটে নামের কনডেন্সড মিল্কের টেট্রাপ্যাক। খুঁজে পেতে চা খাওয়ার মগটা বের করা গেলেও চিনির কৌটাটা কেনো যেনো আমার সঙ্গে 'লুকোচুরি' খেলছে। সব হাতের কাছে থাকার পরেও তাই চিনি ছাড়াই চা মুখে তুলতে হচ্ছে।

আমার চা খাওয়া নিয়ে কতোজনই কতো কথা বলে। সর্বশেষ যে কথাটা যোগ হয়েছে তা হলো, আমি নাকি চা খাই-ই চিনি খাওয়া হবে তাই। চিনিহীন চা গলায় ঢালতে ঢালতে টলতে থাকা পায়ে কম্পুর সামনে এসে বসি। একে একে সবগুলো মেসেঞ্জারে লগইন করি, মেইল গুলো খুলে বসি। উঁহু, সব ফকফকা। নতুন কিছু নেই। গত বিশ দিনে সাহারায় হঠাৎ বয়ে যাওয়া সামান্য মরুবাতাসের মতো কেবল একটা মেইলই জ্বলজ্বল করে আসছে। আরএসভিপি ডট কম ডট এইউ থেকে। অকাজের মেইল, জঞ্জালবাক্সে যাবার কথা থাকলেও মেইলটাকে খুলি, প্রতিটা লাইন পড়ি তারপর আবার 'আনরেড' করে রেখে দিই। পরেরবার একই কাজ করি। করছি গত বিশ দিন ধরেই। মেইলটার প্রতিটা শব্দ মুখস্থ হয়ে গেছে। আচ্ছা মুখটা তিতা লাগছে কেনো? আসাম ব্লেন্ডের জন্য! শালার চিনির কৌটা!

এরএসভিপি'র উচ্চারণটা কী! সিলভোপ্লে!! মানে কি দয়াকরুন!
- কে দয়া করবে?

: কে আবার, তনয়া!

- তনয়া, তনয়া কে?

: এহ্, ন্যাকামো করো? তুমি চেন না কে তনয়া?

- সত্যি বলছি, চিনি না। আমার কি তাকে চেনার কথা?

: নয়তো কি? এতোগুলো বছর তার সঙ্গ নিয়ে পার করেছো...!

- আমি পার করেছি তনয়ার সঙ্গ নিয়ে? কি বলছো যা-তা!

: আশ্চর্য! যা-তা বলবো কেনো? তোমার মনে নেই নাকি মনে করতে চাচ্ছো না! ভয় পাচ্ছো, তুমি একটা ভীতু। তুমি কষ্টকে ভয় পাও। তনয়াকে মনে করলে তুমি কষ্ট পাবে, তাই মনে করতে চাইছো না।

- আমি ভীতু না। আমি কোনো তনয়াকে চিনি না। যাকে চিনি না তাকে মনে করে কষ্ট পাবো কেনো!

: তুমি নিজের সঙ্গেই মিথ্যে বলছো।

- মিথ্যে বলবো কেনো? সত্যি বললেই বা তুমি কি ক্ষতি করবে!

: সত্যি বা মিথ্যে- আমি কোনোভাবেই তোমার ক্ষতি করতে পারবো না। আমি তো তুমিই! আমি কেবল তোমার ভুলটা ধরিয়ে দিতে পারবো।

- লাগবে না তোমার ভুল ধরাতে। তুমি যাও। তোমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।

: আরেকটু থাকি? এটা একটা প্লীজ!

- থাকতে পারো। কিন্তু তনয়া ফনয়া নিয়ে কথা বলতে পারবে না।

: আচ্ছা ঠিকাছে। চলো তাহলে অন্যকিছু নিয়ে কথা বলি। আচ্ছা তোমার কি সে জায়গাটার কথা মনে আছে? ঐযে অনেক বিস্তীর্ণ হলুদ রঙের মাঝে হঠাৎ বয়ে চলা একটা সরু সাগর...!

- কোন জায়গার কথা বলছো? সাগর আবার সরু হয় কী করে! এমন কোনো আজগুবি জায়গা কি আমার চেনার কথা!

: আশ্চর্য! এটাতো তোমারই প্রিয় জায়গা। তুমি আমাকে জায়গাটার গল্প বলেছো এই সেদিনও। মনে নেই তোমার!

- একদমই মনে পড়ছে না। তুমি কি আমাকে বলবে জায়গাটার কথা!

: আমিতো বলতেই চাই। ঐযে একটা পায়ে চলা সাদা মেঠো পথ। বাহাদুরপুরের কালীবাড়ির বটগাছটার মতো একটা বুড়ো বটগাছ, তার পাশ দিয়ে বেঁকে নেমে গেছে পথটা সরু হয়ে। যেতে যেতে পথটা ক্ষেতের আল হয়ে যায়। অনেকদূর হেঁটে গেলে হলুদ শর্ষে ক্ষেত। যতদূর চোখ যায় কেবল হলুদ আর হলুদ। সেখানে একটা সাগর। খালের মতো সরু। ঘাসময় ঢালু পাড়ে পা ছড়িয়ে বসলে বিছানো হলদে চাদর ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। সামনে দিয়ে দুয়েকটা ভটভটি জাহাজ পাল উঁচিয়ে চলে যায়। সেখানে সূর্যের তেজ কম, মৃদু বাতাস বয়, তাতে চামেলীর গন্ধ। তুমি সেখানে বসে থাকো। তোমার পাশে বসে থাকে তনয়া। তোমার হাতে হাত রেখে, তোমার কাঁধে মাথা রেখে....।

- থামো থামো। এমন কোনো জায়গার কথাই তো আমি মনে করতে পারি না। আমি কখনোই এমন একটা জায়গায় যাইনি, তোমাকে গল্প বলবো কোত্থেকে! আমি নিজেই যেখানে যাইনি, সেখানে তনয়া নামের অস্তিত্ব কোথায় পাও তুমি বলতো! আমিতো এই নামে কাউকে মনেই করতে পারছি না!

: তুমি মনে করতে চাচ্ছোনা বলে পারছো না। আমাকে আরেকটা সুযোগ দাও, তোমাকে তনয়ার গল্প বলি। তুমি মনে করতে পারবে সব। তার হাতভর্তি রেশমি চুড়ি, সে তনয়া। কোমরসমান লম্বা চুল, সে তনয়া। চোখ নাচিয়ে হাসে খিলখিল করে, এক পায়ে পরা নুপুরের কেমন অদ্ভুত শব্দ তুলে দৌড়ে যায় শর্ষে ক্ষেতের আল ধরে, সে-ই তো তনয়া। শুনবে তুমি, শুনবে তনয়ার গল্প?

- না না, আমার এখন সময় নেই। তুমি যাওতো এখন। তনয়ার গল্প শোনার চেয়ে আমার এখন বেরিয়ে পড়া জরুরী। কাজে দেরী হয়ে যাবে নয়তো...!

Tuesday, March 25, 2008

আক্ষেপ-

১.
প্রথম ট্রেনে চড়ি সেই বাচ্চাবেলায়। বড় হবার আগে সেই রুটটাই উঠে যায়। ট্রেনের অপেক্ষায় বাবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে দুই পাটের ক্রিম মাখানো বিস্কুটের স্বাদ চাখা হয়ে ওঠেনি তারপর আর।

বড়বেলার উপবনের সেই যাত্রাটুকু আর পাওয়া হবে না। চকিত অভিযান শেষে ফেরার পথে প্রচন্ড আবেগে বাড়ানো হাতটা অস্পর্শিতই থেকে যাবে অনাদিকাল। আকষ্মিকতা কিংবা অন্য চিন্তায়, বাড়িয়ে ধরা ভাজ করা ফিনফিনে ওড়নাটা ছুঁয়ে দেখবোনা কখনোই।

সিলেট গিয়েছি আগে। ভবিষ্যতেও যাবো হয়তো! বিশদ চর্বন চলবে যাত্রার, কেবল মনের চিলে কোঠা থেকে বের হয়ে বর্ণগাঁথা হবে না সংক্ষিপ্ত মধুর সে ঘটনার!

২.
"ফ্রো ভাইনাখটেন" - ইস্টারের সময়ে ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা-সম্বোধনে সৃষ্ট প্রশ্নবোধকে ডানিয়েলা তুষারপাতকে নির্দেশ করে। বড্ড বেশী ভুল সময়ে হয়ে গেলো! জানালার সার্শী গলে সাদা ক্যানভাসে চোখ রেখে মুঠোফোনে আলাপ সারি। পেঁজা তুলোর বর্ষণের নিচে হাত ধরে হাঁটা হবে না প্রিয় মানুষটির সাথে। ভুল সময়ে হয়তো ভুল মানুষটিই আপন হয়ে উঠবে কখনো!

৩.
তিব্বতের ঘটনায় চীনের হিংস্রতার খবর টিভি জুড়ে। অলিম্পিকের মতো অনুষ্ঠান বর্জন করা এতো সহজ না! আমি ক্ষুদেমানব, আইওসি'র দাওয়াতনামাটা প্রত্যাখানের অধিকার আমার গণতান্ত্রিক। পরপর চারবার বিশ্বঅলিম্পিকের আয়োজকদের সঙ্গে কাজ করার স্বপ্নের বিনিময়ে তিব্বতে শান্তি ফিরে আসুক, কামনা করি!

Friday, March 14, 2008

গুরুচন্ডালী - ০০৪

: আলেস ক্লা আন্নে?

: ইয়া... আলেস গুটে। দু বিস্ত জেয়ার ডুন গেভোর্ডেন!

মৎস্য আর ঘাস পাতার ওপর গাঁইতি চালিয়ে, বুকের দুরফুর কমানোর লক্ষ্যে গরু খাওয়া বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিলো। আল্টস্টাডে ডরোথীন স্ট্রাসের মুস্তাফার দোকানে তাই হানাও দেয়া হয়নি এই মাসখানেক। কাল বিকেলে কারস্টাডের উপরের তলার ক্যাফেটেরিয়াতে উইণ্ডো সীটে বৃষ্টিস্নাত শহরের বিষণ্ণতায় এক গ্লাস আমরস গলাধঃকরণ করেই এলোমেলো পদক্ষেপে পুরাতন শহরের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। মাসখানেকের বিরতির পর গরুর হাম্বা ডাক আমাকে খুব নস্টালজিক করে দিচ্ছিলো। বৃহষ্পতিবার মুস্তাফা ফ্রেশ গোশত দোকানে তোলে। দেখিই না গিয়ে কী হয়!

মুস্তাফার মা। ষাটোর্ধ তুর্কিশ মহিলা। দাঁতহীন বুড়ো মানুষের মতো কথা বলেন। খুব ভালো জার্মান হয়তো বলেন না, কিন্তু কথা বলেন খুব মায়া করে। তুর্কী আন্নে মানে হলো, মা। আমি দোকানে ঢুকেই ভদ্রমহিলাকে ঐভাবে সম্বোধন করি। কুশল জিজ্ঞেস করি। ভদ্রমহিলা অনেক খুশী হোন।

মুস্তাফা সুন্দর, ভালো, তরতাজা দেখে গোশত নিয়ে কেটে কুটে কয়েকটা ঠোঙা করে দেয়। ও ভালো করেই জানে, ওসব কাটাকুটি আমাকে দিয়ে হয় না, নিজেই সব রেডি করে দিয়ে বলে, "নাও, এবার শুধু হাঁড়িতে তোলা বাকী!"

আমি শত-কোটি ধন্যবাদ দিয়ে ব্যাগটা হাতে ঝুলিয়ে তড়িঘড়ি করে রাস্তায় নেমে আসি। ঠিক পরক্ষণেই হৃদয়ের উষ্ণ ছোঁয়াটুকু ভুলে যাই। ট্রাম ধরার চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। এবং দ্রুত পা চালাই, ট্রামটা মিস হলে আরও পাঁচটা মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হবে!

কাউফহফে দেখা হয়ে যায় নাদিয়া'র সঙ্গে। ম্যানস্ সেকশনে কাজ করে। ঘুরতে ঘুরতে একসময় খেয়াল করি কেউ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চশমা না থাকায় ঠাহর করতে পারি না ঠিক। খুব ধীরে সেদিকে এগোই একটা-দুটো শার্ট-গ্যাঞ্জি নেড়ে নেড়ে। কাছে যেতেই নাদিয়া হাউমাউ করে ওঠে।

"মাই গট। তোমার একী হাল! কি এতো টেনশন করো! ম্যান তোমাকে চেনাই যায় না। তুমি কি ঠিক আছো?"

নাদিয়াকে আশ্বস্ত করি। আমি ঠিকই আছি। শুধু স্ট্রেসের পরিমানটা বেড়েছে। নিজের প্রতি যত্ন বলতে যা বুঝায়, ওটাতে সামান্য ঘাটতি হচ্ছে বটে! সেটা ঠিকমতো হলেই আবার ফুলে ফেঁপে ওঠা যাবে, ব্যাপার না।

কিছু সময় কাটলো নানা আলাপে। নাদিয়া দৌঁড়ে গেলো ক্যাশে ডাক পরেছে বলে। আমি পাশ কাটিয়ে এসকেলেটর ধরে সোজা নিচের ফ্লোরে। নাদিয়ার জন্য আর অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করে না।

কাউফহফ থেকে যখন বেরুলাম তখন আকাশে চালুনীর মতো ফুঁটো। চালের গুঁড়ি যেমন খুব সূ্ক্ষ হয়ে পরে, তেমনি বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে- পটপটকটকট! বেথোফেনের মূর্তির পাশ দিয়ে স্টারবাকস, পিৎজা হাট ছাড়িয়ে ফ্রিডেন প্লাৎস। ডিএম-এ ঢুকতে হবে। কিছু দরকারী জিনিষ না কিনলেই না। অযথাই কয়েকটা পাক ঘুরে তিনটা মাত্র জিনিষ হাতে ধরে চেকআউটে বিল মিটিয়ে বের হবার পথেই ঝপাৎ করে নেমে গেলো। অনেকের মতো ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করলোনা বলেই সোজা হাঁটা দিলাম মার্কটপ্লাৎসের দিকে। ওখান থেকে ক্যাফে গোয়েটলিশ, বুভিয়ের, কার্টহাউজ পেরিয়ে বহুমূখি বাস স্ট্যান্ড।

লাইনের বাস এলো পনেরো মিনিট পর। উঠলাম। দাঁড়ানোরও জায়গা নেই। সামনের দিকে কোনমতে নিজের ভারসাম্য রক্ষা হয় এমন একটা জায়গায় ঠেস দিলাম। পাশের সীটেই এক বয়স্ক মহিলা তার কুকুর নিয়ে বসে আছেন। ভাবছি, কুকুরটা যদি আমাকে কামড়ে দেয়, তাহলে!

আমার ঠিক সামনে নব্বই ডিগ্রী কৌণিক ভঙিতে দাঁড়িয়ে আছে এক ললনা। খুব সম্ভবত পোলিশ হবে। শরীরের গঠনে তাই মনে হয়। তার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে না।

আমার এখন জানালার কাঁচে এঁকেবেঁকে বৃষ্টির গড়িয়ে পড়া পানি দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। কিন্তু সমস্যা হলো জানালাটা দেখতে হলে ললনাটির ঠোঁট সমান উচ্চতায় আমাকে তাকাতে হয়। বাদ দিলাম। কারণ, আমার বাম পাশের যে ভদ্রলোক আছেন তিনি মনে করছেন আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ললনাটিকে দেখছি। তার দিকে না তাকিয়েও আমার দিকে তার দৃষ্টি বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছিলো আমাকে।