Wednesday, October 29, 2008

বসন্ত যেভাবে ঋতুরাজ হলো-

শরতের আকাশ নিয়ে কোন দ্বিমত নেই। বছরের সবচাইতে সুন্দর আকাশ দেখা যায় ওই সময়টায়। ঘাসের ওপর সটান শুয়ে সাদা সাদা মেঘের মধ্যে পালতোলা নৌকা, হাতি, প্রিয়জনের মুখ সবই বানানো যায়। কিন্তু যখন রোদ ওঠে, পিঠে গিয়ে লাগে!

যখন 'ঋতুরাজ' নির্বাচনের ভুটাভুটি হয়, তখন ভালোলাগার দিক থেকে শরৎ বেশ কিছু ভোট পেয়েছিলোও বটে। কিন্তু ঠিক তার পরের ব্লকেই হেমন্ত নামের আগুন একটি ঋতু বাস করে বলে ঋতুরাজ হিসেবে তার কপালের শিঁকে ছিঁড়েনি। আর বড়ই আকর্ষণীয়, মনকাড়া রূপসৌন্দর্য্য নিয়েও হেমন্ত ভুটে জিততে পারেনি ঠিক তার পাশেই অমন দিল ধাকধাককরা মাধুরীর মতো মিষ্টি 'শরৎ' ছিলো বলে!

গ্রীষ্ম আর বর্ষা ভুটের রাজনীতিতে খুবেকটা সুবিধে করতে পারেনি। শোনা যায় তারা নির্বাচন কমিশনের আদেশকে পেঁয়াজ-কাঁচামরিচসহ মুড়ি খাওয়ার আহ্বান জানিয়ে, বৃদ্ধাঙুল দেখিয়ে ইলেকশনে নয়ছয়রঙা পোস্টার ছাপায়। ঝড়-তুফান-বৃষ্টি আর কাঁদার দেয়াল লিখনে ভরে তোলে যত্রতত্র। আর্মি ইন্টেলিজেন্স তো দাবী করে ভুটের আগের রাতে নাকি 'গ্রীষ্ম' রীতিমতো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে জনগণকে 'উপঢৌকণ'ও প্রদান করে। এইযে এতো এতো ফল পাই আমরা গ্রীষ্মকালে, এগুলো তো সেই উপঢৌকণেরই বাইপ্রোডাক্ট!

শীত বেচারা একটু ম্যাদা মার্কা ছিলো ছোটকাল থেকেই। অনেকটা আমার মতো আলসে। চাদর মুড়ি দিয়ে খালি ঘুমায় ব্যাটা। অনেক চমকদার, রকমফেরী শাক-সব্জি আর সুস্বাদু খেজুরের রসের প্রত্যক্ষ সাপোর্ট থাকা সত্বেও কেবলমাত্র আলসেমীর কারণেই কিনা ইলেকশানে পিছিয়ে গেলো ব্যাটা! শালা একটা ফাজিল বটে!!

শেষমেশ টেক্কাটা মারলো সুযোগসন্ধানী 'বসন্ত'। গ্রীষ্মের নামে দুদকে দুর্নীতির মকদ্দমা ঠুঁকে তাকে হঁটিয়ে দেয় ইলেকশানের রিলেশান থেকে। গ্রাসরুটের প্রবল সমর্থন থাকা শীতের আলসেমীর বিরুদ্ধেও সে সোচ্চার, কখনো শীতল আর কখনো অগ্নিময় কথাবার্তায় কাঁপিয়ে তোলে বাংলার পথঘাটপ্রান্তর। নিজের ইলেকশনের প্রচারণার জন্য ইমপোর্ট করে উপমহাদেশের নামীদামী সঙ্গীত শিল্পী 'কুকিল'কে। কুকিল তার কণ্ঠের ইন্দ্রজালে জড়িয়ে নেয় গোটা সিলেকশনবোর্ড। সবাই সুন্দরের পূজারী। জনগণও তাদের বয়ষ্ক বউদের ঘরে রেখে চ্যাঙড়া কুকিলের জলসায় হাজির হয়। সুযোগ বুঝে বসন্ত ঘোষনা দিয়ে বসে, "ভাইসব, আপনারা আমাকে ঋতুরাজ হিসেবে নির্বাচিত করুন। আমি নিজের তহবিল থেকে খরচ করে আপনাদের ঘরে বসে কুকিলের সুকণ্ঠি অমৃত সেবনের ব্যবস্থা করে দিবো!" পটেটো সিনড্রোমের জনগণ আর কী করে! দিলো নিজের ভুটখানা বসন্তকেই।

সেই থেকেই না বসন্তকে ঋতুরাজ মানার নিয়ম!

Saturday, October 18, 2008

গুরুচন্ডালী - ০১১

প্রসঙ্গঃ দে দৌঁড়ঃ

বৈরাগী মন হলে যা হয় আরকি। ঘরবাড়ি-বিধি-বাঁধন ভালো লাগে না। মন খালি উড়ুৎ ফুরুৎ করে। সব ছেড়ে ছুড়ে ভাগা দিতে মন চায়। সবাই যেখানে সামনের দিকে দৌঁড়ায়, দৌঁড় শেষের লালফিতা ছুঁয়ে বিজয়ী হতে চায় সেখানে আমি হঠাৎ থেমে চোখ বন্ধ করে উল্টা দিকে ছুট লাগাই। কারো চিৎকার চেঁচামেচি কানে আসে না। চোখ বন্ধ হলে কানও বন্ধ হয়ে যায়। মাথায় তখন একটাই চিন্তা কাজ করে। 'দে দৌঁড়', লাগা ভোঁ-দৌঁড়!

কিছুদিন পরপর যখন সবকিছু নাসিকা পর্যন্ত ভরে যায়, যখন আর কোনো কিছু ভালো লাগেনা, যখন সবকিছু অসহ্য হয়ে পড়তে শুরু করে- তখনই সবকিছু থেকে ছুটি নিতে হয় আমার। সবকিছু শাটডাউন করে বেরিয়ে পড়ি একদিকে। কোনো উপলক্ষ থাকলে ভালো নাহলেও ক্ষতি নেই। উপলক্ষ বানিয়ে নিতে কষ্ট হয় না। অনেকদিন থেকেই একটা দৌঁড় ডিউ হয়েছিলো। সবকিছু অসহ্য লাগতে শুরু করেছিলো বেশ কিছুদিন ধরে। নানান ঝামেলায় যখন নাভিশ্বাস চরমে তখনই সুযোগটা এলো। এক সিনিয়র ভাই এলেন ফ্রাইবুর্গে, কনফারেন্সে। চলে গেলাম সেদিকে। ঘুরেফিরে তাঁকে নিবাসগামী ফ্লাইটে তুলে দিয়ে এখন খালাতো ভাইয়ের এখানে অবস্থান নিয়েছি।

হামধূম এবং হাউকাউঃ

খালাতো ভাইয়ের এখানে এলে যে জিনিষটা হয় তা হলো ভোকাল কর্ডের যথেচ্ছা ব্যবহার। সবাই চিল্লায়। কোনো কারণ ছাড়াই। আমিও চিল্লাই। হুদাহুদিই। মাঝে মাঝে ভাবীকে জিজ্ঞাসী, হুদাহুদি চিল্লাও ক্যা? আস্তে বললেই তো শুনি। ভাবী জবাব দেন, তোমার ভাইয়ের লগে চিল্লাই, ভাইস্তা-ভাস্তির লগে চিল্লাই, তুমিও মাশাল্লা কম যাও না। দশবার না কইলে কথা কানে তুলো না। অতএব, চিল্লানো ছাড়া গতি নাই, কিছুই করার নাই গোলাম হোসেন। এই যেমন এই লেখাটা লেখার সময় কম করে হলেও তিনবার আমার উঠতে হয়েছে। একবার খাওয়ার জন্য। একবার গোসল করার জন্য আরেকবার কেনো উঠছি সেটা ভুলে গেছি। এবং প্রতিটা বারেই মহাতোড়েজোরে হাউকাউ হওয়ার আগে উঠি নাই। বিনাযুদ্ধে নাহি দেবো শূচাগ্র মেদিনী। একেবারে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়ে গেছি! হাসি

... এবং খোমাখাতাঃ

ফেইসবুকে বন্ধু হবার আহ্বান এসে জড়ো হচ্ছে দিনদিন। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করতাম। এখন আস্তে করে ফেলে রাখি যদি অচেনা বা আধাচেনা হয়। পুরানো কিছু বন্ধু, কিছু পরিচিত মুখ বন্ধু তালিকায় যোগ হয়েছে। কথাবার্তা চালাচালি, মন্তব্য আদান-প্রদান, বার্তা প্রেরণ-গ্রহন সবই চলে এই মুষ্টিমেয় কয়েকজনের মধ্যে।

এরই মধ্যে একদিন কানাডা থেকে মামাতো বোন জানালেন, "হুমম দেখছিরে দেখছি..."। আমি বলি কী দেখছেন? "কী আবার তোর জার্মান বান্ধবী!" আমি মনে মনে ভাবি, 'লেও হালুয়া! আমার বান্ধবী আর আমি নিজেই দেখলাম না?' চিন্তিত বেশ কয়েকপ্রস্ত জেরা-প্রতিজেরার পর বুঝা গেলো যাকে আমার জার্মান বান্ধবী বলে বোন ভুল করেছিলো সে আসলে আমার (গার্ল)বান্ধবী নয়। আমেরিকা থেকে গোয়েটে ইনস্টিটিউটে পড়তে আসা এক বালিকা। তার একুশতম জন্মদিনটাকে একটু স্মরণীয় করে রাখতে কোলনের কয়েকটা জায়গায় ঘুরতে গিয়েছিলাম মাত্র! সব কিছু খুলে বলতেই বোনের মুখ থেকে "আহা" জাতীয় কিছু একটা বেরিয়ে গেলো। আর আমি মনে মনে বলি, "আমার কোনো ডোরে বাঁধা পড়া কিংবা ডোরে বেঁধে ফেলা এতোই সোজা!"
তবে খোমাখাতা নিয়ে গিয়ানজামের অবকাশ সর্বদাই রয়ে যায় আমার ক্ষেত্রে।

ধুরো হালায়...

ফ্রাঙ্কফুর্টে না কই যাইবো খালাতো ভাইয়ের ফ্যামিলি ঈদের (পূনর্মিলনী) পার্টিতে। এখন বাঁটে পইড়া আমারেও তাগো লগে যাইতে হইবো। এই নিয়া বাসায় পুরাদমে হাউকাউ। আমি শান্তিমতো একটু ব্লগামু তারও সিসটেম নাই। আমারে রেডি হওনের লাইগ্যা চাইরজনে প্রতি দশ সেকেন্ড অন্তর অন্তর তাগাদা দিতাছে। ঐ যে আবার বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া শুরু হইছে। ধুরো বাল যাইগা....!

Wednesday, October 08, 2008

গুরুচন্ডালী - ০১০

তালাচাবি মার্কায় ভোট দিনঃ

না, কোনো নির্বাচনে প্রার্থীর প্রচারের দায়িত্ব পাইনি। খুব প্রিয় একজন মেম্বারের কথা মনে পড়ছে এই ক্ষণে। তিনি আর কেউ নন, সচলায়তন ইউনিয়ন পরিষদের মান্যবর গমচোর শালিখেলাপি মেম্বর "দ্রোহী"। অনেকদিন ধরে লা-পাত্তা তিনি। নানাজনে নানা কথা বলে এ নিয়ে। আমি অবশ্য বিশ্বাস করি, সকল স্ত্রীকুলের অগ্নিচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি পত্রপাঠ সচলায়তনে যোগ দিয়ে আমাদের বাধিত করবেন। বলাই বাহুল্য, মেম্বরের শোকে চেয়ারম্যান কঠিন জ্বর-কাশিতে ভুগছেন আর ছড়া-টড়া লিখে যাচ্ছেন। এটা অবশ্য অসমর্থিত দুষ্টলোক প্রদত্ত তথ্য! হাসি

ঈদ ও চন্দন দ্বীপের রাজকন্যাঃ

গেলো সোমবার রাতে এক ফোঁটাও ঘুম হয়নি। ঘুমিয়ে পড়লে অন্য বারের মতো এবারো ঈদের নামায থাকতো শিঁকেয় তোলা হয়ে। সময়মতো পাঞ্জাবি গায়ে চড়িয়ে, তাতে সুগন্ধি -টুগন্ধি মেখে, নামায শেষে জনগণের সঙ্গে জাতাজাতি-জাবড়াজাবড়ি-পাচড়াপাচড়ি করে বাসে, ট্রামে, চেয়ারে, সোফায় ঢুলঢুল করে অবশেষে নিজের বিছানায় এসে ধপাশ! পরদিন এবং তার পরদিন সুযোগ এসেছিলো হাতের রিমোট নেড়ে এনটিভি-চ্যানেল আই-এটিন বাংলা পরিদর্শনের। অনেক দর্শনীয় জিনিষের মাঝে যা মন কাড়লো তা হলো নায়ক ওয়াসিম ভাই অভিনীত চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা। প্রিয় নায়িকা অঞ্জু ঘোষ আর ইলিয়াস কাঞ্চনের কী আরেকটা ছবি ছিলো, নামটা মনে নেই। খালি অপেক্ষা করছিলাম কখন পর্দায় অঞ্জু ঘোষকে দেখা যাবে, আর তাঁর ডায়ালগ নিঃসৃত নিঃশ্বাসের ফোঁসফোঁস শব্দে কান খাড়া হয়ে যাবে! ওখানে আবার পোয়াবারো হিসেবে লাস্যময়ী নূতনও হাজির হয়েছিলেন বেশ কয়েকবার। চোখ টিপি

... এবং দূরালাপনীঃ

বৃহষ্পতিবার খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেলো। একটু বুড়িয়ে গেছি বুঝতে পারি যখন দেখি শত চেষ্টায়ও আর ভেঙে যাওয়া ঘুম আর জোড়া লাগাতে পারিনা। কী আর করা, ফোন টেপাটেপি শুরু করলাম। উদ্দেশ্য ঢাকায় ফোন লাগানো। এক বন্ধুর নাম্বারে ঘুরাচ্ছি তো ঘুরাচ্ছিই। কী এক আজব সাউন্ড শোনায়, বিজি টোন নাকি লাইনই ঢুকে না- আওয়াজ শুনে বোঝার উপায় নেই। পাক্কা দেড় ঘন্টা ট্রাই করলাম একবার বাসার ফোনে আরেকবার মোবাইল ফোনে পর্যায়ক্রমে। দেড় ঘন্টা পর ত্যাক্ত হয়ে মাথার পরে কম্বল মুড়ি দেওয়ার আগে মোবাইল খুলে নাম্বারটা যাচাই করতে গিয়ে দেখি দুইটা নাম্বারেরই তিন আর চার নম্বর সংখ্যাটা জায়গা বদল করে আছে। মানে দেড়টা ঘন্টা হুদাই জলে গেলো, ঘুমানোর চেষ্টায় শুয়ে শুয়ে হাতিঘোড়া মারলেও এতোক্ষণ কাম হইতো!

এর আগে কথা হয় বাড়িতে। এটা রুটিন। প্রতি ঈদের সকালেই। প্রতিবারই ফোন করলে শুনি এইমাত্র নামায শেষ করে ঘরে ফিরলেন আব্বা। কথাহয় সাধারণ, এটাসেটা নিয়ে। এরপরের ঘটনাটা ঘটে খুব দ্রুত। আব্বার হাত থেকে ফোন চলে যায় মায়ের কাছে। প্রথম প্রথম এই পর্যায়ে দশ মার্কের ক্যুইজ দিতে হতো! কী রান্না হলো, কী খেয়েছি, কেমনে রেঁধেছি- এইসব! সাথে থাকতো ডেজার্ট হিসেবে হাউমাউ কান্না। গত কয়েকবছর ধরে এই সুযোগটা ভদ্রমহিলা পাচ্ছেন না। ফোন হাতবদল হওয়ার সময় থেকেই শুরু হয়ে যায় আমার হাউকাউ। ফোন কানে তুলেই জননী তব্দা খেয়ে যান, "পোলা কি সামনে ইলেকশনে খাড়াইবো নাকি!" আধা মিনিটের মতো তুমুল হৈচৈ করে পরে জিজ্ঞেস করি, কী রান্না হলো, কে কে এলো, কে কে আসবে, ক্যামনে কী!
বেচারী আমার প্রশ্ন, পাতি প্রশ্ন, লেঞ্জা প্রশ্ন- এসবের জবাব দিতে দিতে হঠাৎ বলে ওঠেন, "চুলায় কী জানি পুড়লো রে!" আমিও চামে দিয়া বামে কেটে পড়ি।

... এবং তুমি

এবং তোমাকে বলার আপাততঃ এখানে কিছুই নেই। তুমি সচলায়তন পড়বে না, পড়লেও এই লেখার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝবে না! তারচেয়ে আগে তো তোমাকে খুঁজে বের করি, তারপর নাহয় কথার ঝাঁপি খুলে নিয়ে বসা যাবে।

Monday, September 22, 2008

হাতির বাড়িতে গরীবের পা

বলাই'দা হঠাৎ অসময়ে মুঠোফোনে ফোন্দিলেন। এই লাইনখানা পড়ে সচলায়তনের পাঠকগণ যদি মনে করছেন আমি অচ্ছুৎ বলাইয়ের কথা বলছি তাহলে তাদের তরে আমি বলিষ্ঠ কণ্ঠে জানিয়ে দিতে চাই, "জ্বী হ্যাঁ জনাব। আপনি ঠিকই ধরেছেন!"

তো যা বলছিলাম। বলাই'দা ফোন্দিয়ে জানালেন তাঁর এক চাচাতো শালীর খোঁজ পাওয়া গেছে লতাপাতার সূত্রে। মিসেস বলাই আবার আমার লেখার বিশেষ ফ্যান বিধায় আমার এই দূর্ভাগা দূর্দশা দূর করতে নিজেই এগিয়ে এসেছেন। মাঝখানে বলাই'দা বারখানেক ট্যাঁওম্যাঁও করার চেষ্টা করেছিলেন বৈকি, কিন্তু ভাবী সাহেবার রক্তচক্ষু আর রান্না ঘরের কোণে বিশেষ যত্নে সংরক্ষিত চেলাকাঠটি অবলোকন করেই দমে গেলেন এবং আমাকে ফোন্দিলেন। তিনি জানালেন বাসার স্ক্যানার নষ্ট এবং ভাবী সাহেবা চাইছিলেন যেনো আমার হাতে হার্ডকপিটাই এসে পরে তাই হরকরা হিসেবে হিমুকে বেছে নিয়ে আমার কাছে বলাই'দার সেই লতাপাতায় জরানো চাচাতো শালীর ফটুক খানা প্রেরণ করেছেন। এইখানে পাঠক যদি মনে করেন আমি সচলের মোটারাম হিমু'র কথা বলছি তাহলে বলবো, জ্বী না জনাব, আপনার ধারণা আংশিক রঙ্গীন ও বাকীটা ভুল! এই হিমু আমার দোস্ত হিমু, যাকে দেখতে হলে প্রখর রৌদ্রের মাঝেও আপনাকে দেড় ব্যাটারীর টর্চ হাতে রাখতে হবে!

হরকরার জায়গায় হিমুর নামটা শুনেই আমার মনের দূর্দশার দরজা সমানে কড়া নাড়তে লাগলো। আমার উশখুশ ভাব লক্ষ্য করে বলাইদা হেতু জিজ্ঞেস করলেন। বললাম, 'বলাই'দা করছেন টা কী! আমি আমার নিজের বউরে দিয়া দোস্ত হিমুরে বিশ্বাস করতে পারি কিন্তু কারো শালী দিয়া না। ব্যাটা পুরা এলজিডি আমলা-মন্ত্রীদের মতো আমার জন্য পাঠানো ফটুকখানা আত্মসাৎ করে না দিলেই হয়!

শুনে বলাই'দা হাসলেন। বললেন, এই সাহস যাতে হিমু না পায় সেজন্য পাহারাদার হিসেবে বদ্দাকে সঙ্গে পাঠানো হয়েছে। তিনি মুরুব্বী মানুষ, দেখেশুনে রাখবেন! বদ্দার কথা শুনে কিঞ্চিৎ ভরসা পেলাম বটে, কিন্তু মনের কুডাক ডাকা আর সরে না। নামের মাঝেই কেমন বদ-বদ একটা ব্যাপার আছে। বদ্দা যদিও বেসিক্যালী আপাদমস্তক ভদ্রলোক কিন্তু হিমুর পাল্লায় পড়ে কে যে কখন কী করে বসে বুঝা দায়! যদি দুইজনেই গোপন পরিকল্পনায় ফিফটি-ফিফটি শেয়ারে ফটুকটা হাপিশ করে দেয় তাইলে!

এরকম সাতপাঁচের প্যাচ নিয়ে ভাবতে ভাবতে উড়নচণ্ডীর বেশে গিয়ে হাজির হলাম স্টেশনে বলাই'দার জানানো সময়মতো। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানো বদ্দাকে দেখে যতোটা ভালো লাগলো ঠিক ততোটাই পিলে চমকে উঠলো কুঁজো হয়ে রেলিং ধরে দাঁড়ানো বদমাশ হিমুটাকে দেখে। আমি বুঝে গেছি, ঘাপলা একটা হয়েছে। সেটা যে কী, এটাই এখন উদ্ধার করার পালা।

কাছে যেতেই হিমু হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলো। দোস্ত তুই আমারে মার, আমারে কাট, কাইট্যা বুড়িগঙ্গায় ভাসায়া দে!
আমি বলি, অই শালা, এই বিঁভুইয়ে বুড়িগঙ্গা পামু কই! বি প্র্যাকটিক্যাল ম্যান।

হিমু টি-শার্টের কোণা তুলে চোখ মুছে বলে তাইলে রাইনেই ভাসায়া দে দোস্ত....!

বদ্দা এবার ধমক দিয়ে বলেন, মেয়ে মানুষের মতো ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করো ক্যান মিয়া? খুইলা কও যা হইছে!

হিমু শুরু করলো, বদ্দা বয়স্ক মানুষ।

বদ্দা, বেনী দোলান।

এতোদূর জার্নীর ধকল সইতে না পেরে মাঝপথে গেলো ঘুমায়া। এমন সময় আমাদের পাশের সীটে আসলো দুই হিস্পানিক তরুনী। উফ এক্কেরে সেইরম উহুলালা টাইপের...।

আমি বাগড়া দিলাম, "রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করুন। রোজার দিনে খারাপ কথা ুদাইবেন না জনাব!"- এগুলা বিটিভিতে দেখস নাই ব্যাটা?

হিমু নিজের ভুল বুঝতে পেরে জিভ কাটে, উপপস... এন্টশুলডিগুং।

আবার শুরু করে, তো হিস্পানিক তরুনীদের দেখে আমার সেইরম কিছু ইচ্ছা শুরু হইলো। টুকটাক হিস্পানিক জানি বিধায় হুইসস্পার করে তাদের কানের কাছে বলতেই তারা আমার হাত ধরে নিলো সখা ট্রেনের খালি কামড়ার দিকে।

বদ্দা কই? আমি উত্তেজিত।

হিমুর জবাব, তখনো ঘুমায়!

আমি বলি, গরমের আঁচ লাগে না?

হিমু বলে, মনেহয় না। কারণ রুশ দেশে মনেহয় বরফ পড়া শুরু হইয়া গেছে।

হিমু বয়ান করে চলে। খালি কামড়ায় নিয়ে আমাকে একজন জাপটে ধরলো। আমি মনের খুশীতে চোখ বুজে বগল বাজানো শুরু করলাম। বাকীজন আমার প্যান্টের পেছনের পকেটে যেখানে মানিব্যাগ আছে সেখানে হাতাহাতি শুরু করলো। আমি ব্যাপারটা উপভোগ করতে থাকলাম। উপভোগের চরমে পৌছে আমি যখন ইডেনের পেয়ারা গাছের দিকে হাত দিতে যাবো তখন খেয়াল করলাম কখন যেনো আমাকে দুই হিস্পানিক তরুনীই আলগা করে রেখেছে। মানে তাদের কোনো স্পর্শ পাচ্ছি না। ইডেনের সুখ ছেড়ে ঢুলুঢুলু চোখ খানিক মেলতেই টের পেলাম হিস্পানিক তরুনীদয় পালিয়েছে। সঙ্গে নিয়ে গেছে আমার সর্বস্ব... ইঁইঁইঁইঁ...

ধমক দিয়ে ফ্যাঁচ ফ্যাঁচানি কান্না থামালাম। ইতোমধ্যে বদ্দা হিমুর মাথা নিজের কাঁধে নিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে, থাক থাক আর কাইন্দ না। কাসেলে ফিরা গিয়া ফ্লোমার্কট থাইকা আরেকটা কিইন্যা দিমু নে!

আমি বুঝিনা কী কিনে দেবার কথা বলেন বদ্দা। জিজ্ঞেস করি, বলাই'দা যে বললো, সেই জিনিষ কই!

এবার বদ্দা ক্ষেপে গেলেন আমার সঙ্গে। তুমি বাড়া বাংলা বুঝনা? পোলাটা কানতাছে কি হুদাহুদিই?

ধমক খেয়ে চুপসে গেলাম। কিন্তু মাথায় তখনো ঢুকছেনা, বলাইদার লতাপাতা চাচাতো শালীর ফটুকের সঙ্গে হিস্পানিক তরুনীর পালিয়ে যাওয়ার সম্পর্কটা কোথায়! হিমুই বা কাঁদে ক্যান? আর কথা বাড়ালাম না। বদ্দার ঝারি যারা খান নাই তারা বুঝবেন না কেনো আর কথা বাড়াই নাই!

স্টেশন থেকে বের হয়ে বাসস্টপের দিকে যেতেই হিমু হঠাৎ বজ্রাহতের মতো ঠাঁয় হয়ে গেলো! বদ্দাও। কোনো এক কালের লিজেন্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সাক্ষাতের ধকল তারা সইতে পারবেন কেনো? বাংলাদেশের এযাবৎকালের সকল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর শ্বেতপাথরের নাম ফলকে এই লিজেন্ডের নাম প্রথম পাঁচ নম্বরে জ্বলজ্বল করে। মহাকামেল ব্যক্তি!

দেরী হলেই এই কামেলের কামিলতি দেখতে হতে পারে এই ভেবে সামনে দাঁড়ানো বাসে চড়ে বসি তিনজনেই। গন্তব্য অজানা। এই অজানা গন্তব্যে পৌঁছে দেখা মিললো লিটন ভাইয়ের। লিটন ভাই ব্যস্ত মানুষ, তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেলেন কিছুক্ষণের মাঝেই। যাওয়ার আগে অবশ্য আলাভোলা লিটন ভাইকে ধরে ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে অমিয় সূধা পান করিয়ে ফেললো হিমু। বেচারা লিটন ভাই ঐ অবস্থাতেই পগারপাড় হলেন!

তার পরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত ও বর্ণনামুক্ত। আমাকে দিয়ে বিখ্যাত খিচুড়ি রান্না করিয়ে নিজের উদরপূর্তি করে ফিরতি ট্রেনে চেপে বসলো দোস্ত হিমু। ট্রেনে তুলে দেবার আগে যেইনা ফটুকের কথা তুলতে যাবো অমনি আবার কান্না শুরু হয়ে গেলো বেচারার। এই দেখে বদ্দা তেড়ে এলেন। কিছু বলার আগে আমি নিজেই বলে ফেললাম, "আমি বাড়া বাংলাও বুঝিনা!" :(

ট্রেন ছেড়ে দিলো। আমি একাকী স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসলাম। মনের কোণ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেলো, "ইশ, আর এই ইট্টুনির লাইগ্যা...!"