Showing posts with label guru-chondali. Show all posts
Showing posts with label guru-chondali. Show all posts

Saturday, October 18, 2008

গুরুচন্ডালী - ০১১

প্রসঙ্গঃ দে দৌঁড়ঃ

বৈরাগী মন হলে যা হয় আরকি। ঘরবাড়ি-বিধি-বাঁধন ভালো লাগে না। মন খালি উড়ুৎ ফুরুৎ করে। সব ছেড়ে ছুড়ে ভাগা দিতে মন চায়। সবাই যেখানে সামনের দিকে দৌঁড়ায়, দৌঁড় শেষের লালফিতা ছুঁয়ে বিজয়ী হতে চায় সেখানে আমি হঠাৎ থেমে চোখ বন্ধ করে উল্টা দিকে ছুট লাগাই। কারো চিৎকার চেঁচামেচি কানে আসে না। চোখ বন্ধ হলে কানও বন্ধ হয়ে যায়। মাথায় তখন একটাই চিন্তা কাজ করে। 'দে দৌঁড়', লাগা ভোঁ-দৌঁড়!

কিছুদিন পরপর যখন সবকিছু নাসিকা পর্যন্ত ভরে যায়, যখন আর কোনো কিছু ভালো লাগেনা, যখন সবকিছু অসহ্য হয়ে পড়তে শুরু করে- তখনই সবকিছু থেকে ছুটি নিতে হয় আমার। সবকিছু শাটডাউন করে বেরিয়ে পড়ি একদিকে। কোনো উপলক্ষ থাকলে ভালো নাহলেও ক্ষতি নেই। উপলক্ষ বানিয়ে নিতে কষ্ট হয় না। অনেকদিন থেকেই একটা দৌঁড় ডিউ হয়েছিলো। সবকিছু অসহ্য লাগতে শুরু করেছিলো বেশ কিছুদিন ধরে। নানান ঝামেলায় যখন নাভিশ্বাস চরমে তখনই সুযোগটা এলো। এক সিনিয়র ভাই এলেন ফ্রাইবুর্গে, কনফারেন্সে। চলে গেলাম সেদিকে। ঘুরেফিরে তাঁকে নিবাসগামী ফ্লাইটে তুলে দিয়ে এখন খালাতো ভাইয়ের এখানে অবস্থান নিয়েছি।

হামধূম এবং হাউকাউঃ

খালাতো ভাইয়ের এখানে এলে যে জিনিষটা হয় তা হলো ভোকাল কর্ডের যথেচ্ছা ব্যবহার। সবাই চিল্লায়। কোনো কারণ ছাড়াই। আমিও চিল্লাই। হুদাহুদিই। মাঝে মাঝে ভাবীকে জিজ্ঞাসী, হুদাহুদি চিল্লাও ক্যা? আস্তে বললেই তো শুনি। ভাবী জবাব দেন, তোমার ভাইয়ের লগে চিল্লাই, ভাইস্তা-ভাস্তির লগে চিল্লাই, তুমিও মাশাল্লা কম যাও না। দশবার না কইলে কথা কানে তুলো না। অতএব, চিল্লানো ছাড়া গতি নাই, কিছুই করার নাই গোলাম হোসেন। এই যেমন এই লেখাটা লেখার সময় কম করে হলেও তিনবার আমার উঠতে হয়েছে। একবার খাওয়ার জন্য। একবার গোসল করার জন্য আরেকবার কেনো উঠছি সেটা ভুলে গেছি। এবং প্রতিটা বারেই মহাতোড়েজোরে হাউকাউ হওয়ার আগে উঠি নাই। বিনাযুদ্ধে নাহি দেবো শূচাগ্র মেদিনী। একেবারে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়ে গেছি! হাসি

... এবং খোমাখাতাঃ

ফেইসবুকে বন্ধু হবার আহ্বান এসে জড়ো হচ্ছে দিনদিন। প্রথম প্রথম ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করতাম। এখন আস্তে করে ফেলে রাখি যদি অচেনা বা আধাচেনা হয়। পুরানো কিছু বন্ধু, কিছু পরিচিত মুখ বন্ধু তালিকায় যোগ হয়েছে। কথাবার্তা চালাচালি, মন্তব্য আদান-প্রদান, বার্তা প্রেরণ-গ্রহন সবই চলে এই মুষ্টিমেয় কয়েকজনের মধ্যে।

এরই মধ্যে একদিন কানাডা থেকে মামাতো বোন জানালেন, "হুমম দেখছিরে দেখছি..."। আমি বলি কী দেখছেন? "কী আবার তোর জার্মান বান্ধবী!" আমি মনে মনে ভাবি, 'লেও হালুয়া! আমার বান্ধবী আর আমি নিজেই দেখলাম না?' চিন্তিত বেশ কয়েকপ্রস্ত জেরা-প্রতিজেরার পর বুঝা গেলো যাকে আমার জার্মান বান্ধবী বলে বোন ভুল করেছিলো সে আসলে আমার (গার্ল)বান্ধবী নয়। আমেরিকা থেকে গোয়েটে ইনস্টিটিউটে পড়তে আসা এক বালিকা। তার একুশতম জন্মদিনটাকে একটু স্মরণীয় করে রাখতে কোলনের কয়েকটা জায়গায় ঘুরতে গিয়েছিলাম মাত্র! সব কিছু খুলে বলতেই বোনের মুখ থেকে "আহা" জাতীয় কিছু একটা বেরিয়ে গেলো। আর আমি মনে মনে বলি, "আমার কোনো ডোরে বাঁধা পড়া কিংবা ডোরে বেঁধে ফেলা এতোই সোজা!"
তবে খোমাখাতা নিয়ে গিয়ানজামের অবকাশ সর্বদাই রয়ে যায় আমার ক্ষেত্রে।

ধুরো হালায়...

ফ্রাঙ্কফুর্টে না কই যাইবো খালাতো ভাইয়ের ফ্যামিলি ঈদের (পূনর্মিলনী) পার্টিতে। এখন বাঁটে পইড়া আমারেও তাগো লগে যাইতে হইবো। এই নিয়া বাসায় পুরাদমে হাউকাউ। আমি শান্তিমতো একটু ব্লগামু তারও সিসটেম নাই। আমারে রেডি হওনের লাইগ্যা চাইরজনে প্রতি দশ সেকেন্ড অন্তর অন্তর তাগাদা দিতাছে। ঐ যে আবার বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া শুরু হইছে। ধুরো বাল যাইগা....!

Wednesday, October 08, 2008

গুরুচন্ডালী - ০১০

তালাচাবি মার্কায় ভোট দিনঃ

না, কোনো নির্বাচনে প্রার্থীর প্রচারের দায়িত্ব পাইনি। খুব প্রিয় একজন মেম্বারের কথা মনে পড়ছে এই ক্ষণে। তিনি আর কেউ নন, সচলায়তন ইউনিয়ন পরিষদের মান্যবর গমচোর শালিখেলাপি মেম্বর "দ্রোহী"। অনেকদিন ধরে লা-পাত্তা তিনি। নানাজনে নানা কথা বলে এ নিয়ে। আমি অবশ্য বিশ্বাস করি, সকল স্ত্রীকুলের অগ্নিচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি পত্রপাঠ সচলায়তনে যোগ দিয়ে আমাদের বাধিত করবেন। বলাই বাহুল্য, মেম্বরের শোকে চেয়ারম্যান কঠিন জ্বর-কাশিতে ভুগছেন আর ছড়া-টড়া লিখে যাচ্ছেন। এটা অবশ্য অসমর্থিত দুষ্টলোক প্রদত্ত তথ্য! হাসি

ঈদ ও চন্দন দ্বীপের রাজকন্যাঃ

গেলো সোমবার রাতে এক ফোঁটাও ঘুম হয়নি। ঘুমিয়ে পড়লে অন্য বারের মতো এবারো ঈদের নামায থাকতো শিঁকেয় তোলা হয়ে। সময়মতো পাঞ্জাবি গায়ে চড়িয়ে, তাতে সুগন্ধি -টুগন্ধি মেখে, নামায শেষে জনগণের সঙ্গে জাতাজাতি-জাবড়াজাবড়ি-পাচড়াপাচড়ি করে বাসে, ট্রামে, চেয়ারে, সোফায় ঢুলঢুল করে অবশেষে নিজের বিছানায় এসে ধপাশ! পরদিন এবং তার পরদিন সুযোগ এসেছিলো হাতের রিমোট নেড়ে এনটিভি-চ্যানেল আই-এটিন বাংলা পরিদর্শনের। অনেক দর্শনীয় জিনিষের মাঝে যা মন কাড়লো তা হলো নায়ক ওয়াসিম ভাই অভিনীত চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা। প্রিয় নায়িকা অঞ্জু ঘোষ আর ইলিয়াস কাঞ্চনের কী আরেকটা ছবি ছিলো, নামটা মনে নেই। খালি অপেক্ষা করছিলাম কখন পর্দায় অঞ্জু ঘোষকে দেখা যাবে, আর তাঁর ডায়ালগ নিঃসৃত নিঃশ্বাসের ফোঁসফোঁস শব্দে কান খাড়া হয়ে যাবে! ওখানে আবার পোয়াবারো হিসেবে লাস্যময়ী নূতনও হাজির হয়েছিলেন বেশ কয়েকবার। চোখ টিপি

... এবং দূরালাপনীঃ

বৃহষ্পতিবার খুব সকালে ঘুম ভেঙে গেলো। একটু বুড়িয়ে গেছি বুঝতে পারি যখন দেখি শত চেষ্টায়ও আর ভেঙে যাওয়া ঘুম আর জোড়া লাগাতে পারিনা। কী আর করা, ফোন টেপাটেপি শুরু করলাম। উদ্দেশ্য ঢাকায় ফোন লাগানো। এক বন্ধুর নাম্বারে ঘুরাচ্ছি তো ঘুরাচ্ছিই। কী এক আজব সাউন্ড শোনায়, বিজি টোন নাকি লাইনই ঢুকে না- আওয়াজ শুনে বোঝার উপায় নেই। পাক্কা দেড় ঘন্টা ট্রাই করলাম একবার বাসার ফোনে আরেকবার মোবাইল ফোনে পর্যায়ক্রমে। দেড় ঘন্টা পর ত্যাক্ত হয়ে মাথার পরে কম্বল মুড়ি দেওয়ার আগে মোবাইল খুলে নাম্বারটা যাচাই করতে গিয়ে দেখি দুইটা নাম্বারেরই তিন আর চার নম্বর সংখ্যাটা জায়গা বদল করে আছে। মানে দেড়টা ঘন্টা হুদাই জলে গেলো, ঘুমানোর চেষ্টায় শুয়ে শুয়ে হাতিঘোড়া মারলেও এতোক্ষণ কাম হইতো!

এর আগে কথা হয় বাড়িতে। এটা রুটিন। প্রতি ঈদের সকালেই। প্রতিবারই ফোন করলে শুনি এইমাত্র নামায শেষ করে ঘরে ফিরলেন আব্বা। কথাহয় সাধারণ, এটাসেটা নিয়ে। এরপরের ঘটনাটা ঘটে খুব দ্রুত। আব্বার হাত থেকে ফোন চলে যায় মায়ের কাছে। প্রথম প্রথম এই পর্যায়ে দশ মার্কের ক্যুইজ দিতে হতো! কী রান্না হলো, কী খেয়েছি, কেমনে রেঁধেছি- এইসব! সাথে থাকতো ডেজার্ট হিসেবে হাউমাউ কান্না। গত কয়েকবছর ধরে এই সুযোগটা ভদ্রমহিলা পাচ্ছেন না। ফোন হাতবদল হওয়ার সময় থেকেই শুরু হয়ে যায় আমার হাউকাউ। ফোন কানে তুলেই জননী তব্দা খেয়ে যান, "পোলা কি সামনে ইলেকশনে খাড়াইবো নাকি!" আধা মিনিটের মতো তুমুল হৈচৈ করে পরে জিজ্ঞেস করি, কী রান্না হলো, কে কে এলো, কে কে আসবে, ক্যামনে কী!
বেচারী আমার প্রশ্ন, পাতি প্রশ্ন, লেঞ্জা প্রশ্ন- এসবের জবাব দিতে দিতে হঠাৎ বলে ওঠেন, "চুলায় কী জানি পুড়লো রে!" আমিও চামে দিয়া বামে কেটে পড়ি।

... এবং তুমি

এবং তোমাকে বলার আপাততঃ এখানে কিছুই নেই। তুমি সচলায়তন পড়বে না, পড়লেও এই লেখার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝবে না! তারচেয়ে আগে তো তোমাকে খুঁজে বের করি, তারপর নাহয় কথার ঝাঁপি খুলে নিয়ে বসা যাবে।

Thursday, August 28, 2008

গুরুচন্ডালী - ০০৯

০১।

বহুদিন পরে পরানের দোস্তের দন্তমোবারক দেখার সৌভাগ্য হইছে। সেই গুড়াগাড়া বেলায় বাণিজ্যমেলায় গেলে কিংবা কোনো গ্যাদারিং ফ্যাদারিং সংক্রান্ত জায়গায় গেলে তারে বলা হতো তুই যেইখানেই থাকস দন্তবিকশিত হাসি ঝুলাইয়া রাখবি তোর মন্ডলমুখে। এছাড়া তো তোরে চৈত্রমাসের ভর দুপুরেও চর্টলাইট মাইরাও খুঁইজা পাওন যাইবো না।

আমি জিগাইলাম অ দোস্ত দ্রুইট পাহাড় কোনদিকে রে!
দোস্ত জানায়, এইতো দুই ইশটপ পরেই। ক্যা!
আমি বলি এমনেই। কিন্তু কথা হইলো ঐ পাহাড় এপিং পিপিং ছাড়ায়া কালো শহরের দিকে আসলো ক্যামনে?
দোস্ত কয়, কি আবোল তাবোল কস হালার নাতি। হারা দুনিয়া গাড়ি চালায়া ভাইজা খাইলি আর অখন কস ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী কবে থাইকা! তুই কি নীল পাহাড়ের কথাও ভুইলা গেলি নাকি!
আমি এইবার কনফিডেন্ট জবাব ছুড়ি, তা ভুলুম ক্যা হালায় ভূষা। ঐ জিনিষ তো পিপিং লাইনেই!

আমার এই কথা শুইনা দোস্ত আমার হাসতে হাসতে টাশকি খাইয়া যায় আরকি! আমি বেক্কলের মতো নাক ঘঁষতে থাকি। কয়, ঠান্ডা কলের তলে মাথা চুবাইয়া রাখ। ঠান্ডা হইবো!

বুঝলাম ৭ বছর অনেক লম্বা একটা সময়। মাথার ঘুলিঘুপচিতে ফাঁড়ি রাস্তা, সদর রাস্তার মানচিত্র আঁকা থাকার কথা থাকলেও আদতে তা নাই। কখন সেগুলা ম্যালফাংশনের কবলে পইড়া লাইন-বেলাইন হইয়া গেছে সেটা টেরও পাই নাই!

০২।

ভ্রমনরত খালাতো ভাইয়ের সম্মানে পুরা জ্ঞাতিগুষ্ঠি গেছিলাম এমিউজমেন্ট পার্কে। যতোটা টাশকি খাওয়ার কথা আছিলো ততোটা খাই নাই। ক্যান খাই নাই সেইটা লাখ টাকার প্রশ্নো। পল্টি খাওয়া রোলার কোস্টারের চেহারা মোবারক দেইখা ঐদিক দিয়া হাঁটা দেই নাই ভুলেও। ছোট ভাই আর ভাতিজা কয়েকটন পরিমান আনন্দ নিয়া বার কয়েক ঐটাতে চইড়া আসছে। আর নরমাল রোলার কোষ্টার তো পানিভাত!

"ভাসারবান", রোলার কোস্টারের পানির ভার্সন। এইটা ততোটা "ডেন্ডারাস" না মনে কইরা ভাস্তি সহ গেলাম। ভাই আর ভাবী গেলো না। তো লাইন দেখি দুইটা। একটা ওয়াইল্ড আরেকটা স্টোন। আমি তো আর জম্মন ভাষা খুবেকটা বুঝি না। ছোট ভাই দেখে শুনে ভ্রমনরত খালাতো ভাই, আমার ভাস্তি আর আমারে ওয়াইল্ড লাইনে রেখে নিজে আর ভাইস্তা কেটে পড়লো স্টোন লাইনের দিকে। বললো আমাদেরটাই নাকি অপেক্ষাকৃত সহজ।

নৌকার আদলের কোস্টার যাত্রা শুরু করলো। কোন এক ঘুরপথে টুকুশ করে একটা ছবিও উঠে গেলো। সামনে খালাতো ভাই, তারপর ভাস্তি আর একদম পেছনে আমি। ভাস্তি সাইজে তেলাপোকা টাইপের হওয়াতে আমার দুইহাত দিয়ে সীটবেল্টের মতো আটকে রেখেছি। মজাই হচ্ছে। হঠাৎ দেখি সামনে বিশাল বড় খাদ। আমি এই খাদ দেখে ভয়ের চোটে দোয়াদুরুদ পড়াও ভুলে গেলাম। খাদের কিনাড়ায় এসে আর কিছু মনে নেই। যখন সম্বিৎ ফিরলো তখন শুনি ভাস্তি বলতেছে, "চাচা আমি তো পুরা উড়াল দিতাছিলাম!" আর আমি ভাবি, প্রায় সোজা হয়ে পড়ন্ত ঐ নৌকায় যদি কোনোমতে আমার হাতটা ফস্কে যেতো তাইলে কী অবস্থাটা হইতো!

এই ঘটনার অবশ্য শোধ নিছিলাম দুইটা ঘটনা ঘটিয়ে। ঘটনা এক. বিশাল বড় ফ্যামিলি নৌকায় যেখানে বেশ বড় এ্যাবড়ো থেবড়ো পানিপথ পাড়ি দিতে গিয়ে নিজেকে প্রায় গোসল করায়ে বের হতে হয়, সেখানে মাঝপথে বিশাল ঘিরিঙ্গি টাইপের একটা 'পাদ' মেরে। আমাদের সঙ্গী কয়েকজন বিদেশী আরোহীর ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা দেখে মনে যে আনন্দ পাইছি সেইটা ঐ নৌকায় নিজেরে কাকের মতো ভিজে চুপচুপা অবস্থায় আবিষ্কার করার বিরক্তির বর্গের ব্যস্তানুপাতিক।

দ্বিতীয় ঘটনাটার বলি ছিলো আমার সিধামিধা খালাতো ভাই। বেচারা জানখান্দান করা কোনো রাইডেই চড়ে নাই। ট্রেন, চড়কিগাছ এইসব ননহার্মফুল বাহনে উইঠা প্রবল তৃপ্তিতে ঢেঁকুর তুলতে সে যখন মত্ত তখনই তারে নিয়া ঢুকলাম রহস্যময় প্রাসাদে। ঢুকার পথেই এক কিম্ভুতকিমাকার ছদ্মবেশধারী কেউ খালাতো ভাইকে এমন ভয় পাইয়ে দিলো বেচারা আরেকটু হলেই যায় আরকি!

নানা চিপাগলিটলি ঘুরে শেষে গিয়ে হাজির হলাম বিশাল এক হল ঘরে। এখানে দেয়ার ধরে অনেক গুলো চেয়ার সাজানো। চেয়ারের ওপর থেকে আবার শক্ত বেল্টের মতো জিনিষ ঝুলানো। বুঝলাম এইটাই সেইটা! ফ্রী-ফল। একটানে কয়েকশ ফুট উপরে তুলে নিয়ে আস্তে করে ছেড়ে দেয়। ব্যস এইবার বুঝ ফ্রী-ফল কী জিনিষ! ভাইস্তা আর আমি মোটামুটি পিছলাইয়া বের হয়ে আসলাম হল ঘর থেকে। ছোট ভাই রয়ে গেলো। আমার পেছন পেছন দরজা পর্যন্ত এসে খালাতো ভাই বলে কই যাস! বেচারা তো ভাষাবুলি কিছুই বুঝে না। আমি বললাম আমার বাথরুম পাইছে। আপনে থাকেন। ঐযে বগা আছে, বগার সাথে গিয়া বইসা থাকেন। এইখানে মনেহয় থ্রি-ডি সিনেমা দেখাবে। বেচারা হাতের ব্যাগ আমার কাছে রেখে ফিরে গেলো আর ঠিক তার পরপরই সেই হল ঘরটার বাইরের দিকের দরোজাটা গেলো বন্ধ হয়ে। ভাইস্তা বলে, চাচা না ডরায়, হার্ট এ্যাটাক করলে? জবাবে আমি বলি, কেবল আল্লাহরে ডাক এখন!

Friday, July 25, 2008

গুরুচন্ডালী - ০০৮

নেট এর যন্ত্রণা নাকি উইন্ডোজ বিশ্ঠার ভারে আমার কম্পুখানাই গেছে, সেইটা এখনো ধরতে পারতেছি না। কোনো এক পেজে টিবি দিয়া এক পশলা ঘুমের শট মাইরা উইঠা আবার দ্বিতীয় টিবি দেই। এমনেই চলতাছে, চলবো কতোদিন সেইটাও বুঝতে পারতাছি না।

কালকে রাতে তাইরে নাইরে নাই করে ঘরে ফিরে এমএসএনে লগ ইন করছি ব্যাক এন্ডে। ফ্রন্ট এন্ডে চিন্তা করতেছিলাম নানান গ্যাড়াকলে পইড়া অনেকদিন ছাই-ভষ্ম কিছু লেখা হইতেছে না। কী লেখা যায় এই নিয়া যখন ভাবতেছিলাম ঠিক সেই মুহূর্তে ব্লগার্টুনিস্ট সুজন্দা দিলো টোকা। কয়, 'সচলায়তনের ব্যানরে ঐ ব্যাটা এমনে হা কইরা রইছে ক্যান'!

সুজন্দার ঐ কথা শুইনা উড়মান আমি পড়লাম টুক্কুশ কইরা মাটিতে পইড়ে গেলাম। "কন কী দাদা, আপনে বানান নাই তাইলে! চামে চামে দিলাম আমার দোস্তের ঘাড়ে দোষ চাপাইয়া। এই ব্যাটাই নিশ্চই বানাইছে খামখাম টাইপের এই মুখ!"

শুনে সুজন্দা বলে, টু মুখপোড়াস আর বেইকিং পটেটো হোয়াইল সচলায়তন ইজ অন ফায়ার- এইটা ট্রান্সলেশন করতে! পরীক্ষায় কমন পড়ার খুশিতে জাম্প দিয়া মাটিতে নাইমা আসি। তখন আবার দেখি আড্ডাবাজ খোঁচায়। আমি কই, দাদা কোবতে লেখি! বলে শোনাও। শোনাইলাম। সুজন্দা বলে, বাকীটা কই? আমি কই লেখতাছি। কয় লেইখা ব্লগে দিয়া দ্যাও। আমি কই, জো আজ্ঞা!

তো সেই থাইকাই নিদারুণ চেষ্টা করতেছি আমার কোবতেখানা জনগণের সমীপে প্রকাশ করার। কিন্তু পরে খেয়াল হইলো পান্ডুলিপি তো নাই আমার, ব্লগে দিমু ক্যামনে! তখন খিয়াল হইলো, হিমু প্রমুখ দূর্মুখেরা আমাদের কান ঝালাপালা করে নানান পদের গান অডিও করে খাওয়ায়। আমি কেনো আমার কোবতেকে নয়াস্টাইলে ভিডিও আকারে উপস্থাপন করবো না!

ইউটিউবের হাতে পায়ে ধইরা ৩১ মেগার ভিডিও খানা আপলোডাইলাম ঠিকই মাগার দেখতে আমি নিজেই পাই না। ক্যান পাইনা সেই গল্পই প্রথমে করতেছিলাম। চাক্কা ঘুরে তো ঘুরেই। (কোনো সুহৃদয় ব্যক্তি বিশাল ফাইলরে পুচকী বানায়া ইউটিউবে দেওয়া পন্থা জানাইলে বাধিত হইতাম!) ইস্নিপসে তুলতে গেলাম, কয় সন্দিহান ব্যাপার স্যাপার। আমার নিজের কম্পুতে করা ভিডিও ক্যামনে সন্দিহান হয়, বুঝলাম না!

দেখতে পারা যাক আর না যাক ভিডিওখান শেয়ার করলাম আপনাদের সঙ্গে। যেহেতু কোবতেখান আমি ল্যাখছি, তাই জগদ্বিখ্যাত হওয়ার চান্স অনেক বেশি। কেউ অটোগ্রাফ নিতে চাইলে এখনই চাইতে পারেন। পরে আমি বিখ্যাত হইয়া গেলে কৈলাম আর চান্স পাইবেন না, এই আমি কয়ে দিনু!

Monday, June 23, 2008

গুরুচন্ডালী - ০০৭

মন করুণ পর্ব

ধুসর গোধূলি'র মনটা খারাপ করেছে। তা সে যেন-তেন খারাপ না। একেবারে দশাসই রকমের খারাপ। চিনচিনে খারাপ লাগাটা নেই তবে ভোঁতা ভ্যাপসা ভাব আছে। পুরো শূন্যতা না থাজকেও একটু খালি খালি লাগা আছে। আমার এই একটুর জন্য প্রেমে পড়া হলোনা- মন করুণের আপাতঃ কারণ হিসেবে এটাই দাঁড় করানো গেছে!

ট্রেনে উঠে সুবিধামতো জায়গার আকালে কোথায় বসা যায় এই নিয়ে ভেবে যখন এগুচ্ছিলাম তখনই চারজনা সীটের তিনটাই খালি পেয়ে ধুপুশ করে বসে পড়লাম। যেখানে বসলাম সেটা মোটেও আমার পছন্দের জায়গা না। উল্টোদিকে গাড়ি চললে কেমন উল্টা উল্টা লাগে দুনিয়া। নাকমুখ কুঁচকে সামনের সহযাত্রীর দিক দিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নিতেই দেখলাম একজোড়া চোখ বেশ গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আমাকে। আমি তাকালাম সে চোখে। ভয়ানক সুন্দর ফটিকা চোখ। মার্বেলের মতো স্বচ্ছ। একটু জুম আউট করলাম আমার দৃষ্টি। মুখায়বটাও দারুণ মিষ্টি। আরেকটু জুম আউট করলাম। নাহ্, এ পর্যায়ের দর্শনাবস্তুর কথা না বলাই ভালো। জুমইন করলাম। দৃষ্টি ডানে বামে ঘুরে ফোকাস মুখায়বে। নাকের ডগাটা একটু টেপ খাওয়া, একটু খাদ কিন্তু কেমন অদ্ভূত মিষ্টতা ছড়ানো সারাটা মুখ জুড়েই। দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম অন্যদিকে।

দৃষ্টি রেঞ্জের ভেতরে থাকায় বুঝতে পারছিলাম তখন সরিয়ে নেয়া চোখ জোড়া আবার আমার মুখের দিকে ফোকাসিত। একটু পর লেন্স ডানে ঘুরিয়ে জানালায় ফোকাস করার সময় চোখে চোখ আটকে গেলো। গোল গোল চোখ, সরে না। একটু পর নামিয়ে নিলো, সরিয়ে নিলাম আমিও। আবার, এবং আবারও, তারপর আবার! এবার আমি সরাবার আগে ভদ্রতাসুলভ মুখ বাঁকালাম।

বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। ওপরের জানালা কাত করা। ঠান্ডা একটা বাতাস ঢুকছে তাই। খুব সম্ভবত শীত লাগছে। জানালাটা লাগাতে চাইছে, পারছে না। কোনো বাক্য বিনিময় ছাড়াই সাহায্য প্রার্থনা করলো। আমি আস্তে করে উঠে লাগিয়ে দিলাম। সুন্দর-মিষ্টি মুখ ফুটে "আন্তরিক ধন্যবাদ" বের হলো। আমি হাসি দিয়ে ভদ্রতা সূচক উত্তর দিলাম। আবার সেই নীরবতা, দৃষ্টি ক্যামেরার আনুভূমিক সঞ্চারণ এবং সংযোগ! যে কয়বার আটকে গেলো, আমার দেখানো পথ অনুসরণ করে মুখ বাঁকা করে ভদ্রতা করতে চাইলো। ট্রেন যাবে অনেকটা পথ। আমি নেমে যাবো পথে। হিসাব কষছিলাম কোথায় গিয়ে শেষ হবে সুন্দর মুখের যাত্রা।

এক স্টেশন বাকি থাকতে কোলন শহরের নামাঙ্কিত কালো রঙের ব্যাগ থেকে কাগজ বের করে তাতে তাবাক ভরে পাকিয়ে সিগারেট বানানোর ফাঁকে আমার দিকে তাকিয়ে নিলো। কী জানি ছিলো সেই তাকানোতে! সে নেমে যাবে, কেমন লাগছিলো! কিন্তু সে নামলো না। আমার স্টেশনের অ্যানাউন্স হতেই উঠে চলে গেলো দরজার কাছে। এখন নামতে গেলে যদি ভাবে তাকে ফলো করছি! শালার কপাল...

উঠে দরজার কাছে যেতে আবারও চোখে চোখ পড়লো। আবারও সেই হার্টএ্যাটাক করানো মোনালিসা হাসি। নেমে গেলো আগে, পিছনে আমি ও কয়েকজন। ইচ্ছে করেই একটু পিছিয়ে গেলাম। সামনে গিয়ে ঘুরে আবার সে পেছনে এলো। কারও কি নিতে আসার কথা? আসেনি! আমার বাঙ্গুমন দোটানায় পড়ে গেলো। থামবো কি থামবো না! পা চলছে। মাথায় অনেক হিসাব, একের পর এক সশব্দে জট পাকাচ্ছে। চোখ সোজা, পথের দিকে। প্যান্টের পকেটে হাত, স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্লবোরো লাইটের প্যাকেট তুলে নিলো লাইটার সহ। আরেক হাত টুক করে একটা আগরবাতি বের করে সেটা জ্বালায়িত করলো। অবশেষে পা থামলো, থামলাম আমিও। কিন্তু ততোক্ষণে অনেক দূর টেনে নিয়ে এসেছে হতচ্ছাড়া পদযুগল। এখনতো আর ফেরা যায় না!

Friday, May 09, 2008

গুরুচন্ডালী - ০০৬

জ্বর নেই গায়ে অথচ উপরের পাটির ঠোঁটে প্রমাণ সাইজের ক্ষেত্রফল দখল করে বুক ফুলিয়ে ফুঁড়ে উঠেছে কয়েকলক্ষ জ্বরঠোসা। অনুভূতির ব্যাপার তো আসে পরে, দৃষ্টিতেই কেমন কিম্ভুতকিমাকার ঠেকছে জায়গাটা। দেখে মনেহয় যেনো কোনো দুষ্টু বালিকা সিলেটী 'খামের' তাড়নায় আমার ঠোঁটে কামড়ে দিয়েছে!

অবশেষে বহুল প্রতীক্ষিত 'সামার' বাবুর দেখা মিললো। বসন্তের শুরুতে বরফের দেখা দেওয়া মনে বিলম্বিত সামার আসার পাগলা ঘন্টি বাজালেও খুব শীঘ্রই ললনাদের বসনে দুর্ভিক্ষের আভাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে আয়েশ করে। বেচারা চোখ দীর্ঘ নয় মাস পর কিছু কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে বটে কিন্তু মন বেচারা এবারও মিইয়ে থাকবে গ্রীষ্মসূধা পান হতে বিরত থেকে। এইটা একটা "নো-গুড সিচুয়েশন"। চারিদিকে অপার সৌন্দর্যের হাতছানি, আমি সবুজের কথা বলি না, বলি আশরাফুল মাখলুকাতের কথা! যদি হালায় বাজারের লাউয়ের লাহান ইট্টু ছুঁইয়া টুইয়া দেখতে পারতাম!

দুই উইকএন্ড আগে সকাল বেলা সাইকেল নিয়া বাইর হয়ে গেছিলাম সুন্দর একটা দিনের শুরু দেখে। তাপমাত্রা তখনো চান্দিতে এ্যাটাক করা শুরু করেনি। ট্রেনে করে সাইকেল সহ মোটামুটি কিছুদূর গিয়ে সাইকেলট্র্যাকে প্যাডেল মেরে ফিরতিপথ ধরেছিলাম। ১৭ কিলোমিটারের সেই পথটা আক্ষরিক অর্থেই ছবির মতো সুন্দর ছিলো। কখনো কান্ট্রিরোড, কখনো হাইওয়ের সমান্তরালে সরু দ্বিচক্রযানের পথ, সেই পথ আপেল বাগানের ভেতর দিয়ে গিয়ে পড়েছে (গজারী কিংবা পাইন গাছের) জঙ্গলে। মেঠো সেই পথে গীয়ার বদলে হু-হা করে প্যাডেল মেরে ফসলী জমিতে গিয়ে পড়েছি। এখানে শুঁকিয়ে যাওয়া কাঁদানাটির পথ। ট্র্যাক্টরের চাকার তৈরী ইয়া বড় গর্তে তখনো কিছু জমে থাকা পানি। সেই ফসলি জমি পেরিয়ে আবারও কান্ট্রিরোড। কিছুদূর গিয়েই পথটা ঢুকে গেলো একটা ছোট্ট লোকালয়ে। ছোট ছোট একতলা, দোচালা টালির ছাদের বাড়ি। কয়েকটার চিমনী দিয়ে দেখলাম ধোঁয়া উঠছে। শালারা পিচের কয়লা ব্যবহার করে ঘরে আগুন জ্বালাতে। আগের রাত গুলোতে ঠান্ডার প্রকোপটা খুব বেশি না হলেও একদম শূন্যের কাছে ছিলোনা! কুকুরের দড়ি হাতে দেখা মিললো গোটা কয়েক আবাল-বৃদ্ধা-ললনা। ললনা দেখে গতি কিছুটা মন্থর করে, কান থেকে ইয়ারফোনের ডিবলাটা খুলে হুদাহুদিই জিজ্ঞেস করলাম আমি সঠিক ট্র্যাকে আছি কীনা! সুন্দরী অবশ্য কুত্তার দড়ি হাত বদল করে আমাকে তর্জনী বাঁকিয়ে দেখিয়ে দেয় বাকিটা পথের নকশা। আমি সামনের দেখানো পথের দিকে তাকাই না, অপার শৈল্পীকতায় একজন হাওয়া সন্তানের হাতের নড়াচড়া খেয়াল করি ভালো করে। ঈমাণে কই, এই নড়াচড়ার ফলে কোন অঙ্গে কতোটা ঢেউ খাইয়াছিলো তাহা ব্যক্ত করিবার কোনো কুইজ থাকিলে আমি দশে দশ পাইয়া শিক্ষকদিগকে দেখাইয়া দিতাম বটে! কিন্তু আপাতত সে আশার গুড়ে ওড়লা। সময়টা আধা-মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় না।

আমি আবারও প্যাডেলে ঘচাং করে পাড়া মারি। সাইকেল চলতে থাকে। খুব ছোট্ট একটা ঝোপ পেরিয়ে এবার এসে পড়ি বেশ ঢালু একটা জায়গায়। চূড়ায় থাকা আমি অনেক নিচে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের পরিচিত সড়ক দেখতে পাই। তারও নিচে খাদ, সেই খাদ আবার উঁচু হতে হতে আরেক চূড়ায় গিয়ে ঠেকেছে। সেখানে আবার একটা লোকালয়ও আছে। সমান্তরাল রেখায় লোকালয়টি উচ্চতার দৃষ্টিতে আমার সমান হলেও মাঝখানে রয়েছে বিশাল এক দূরত্ব। দার্শনিক এরিস্টটলের মতো মাথা একবার এদিক আরেকবার ওদিক করে প্যাডেলে জোর দিলাম। সাইকেল আমার হাওয়ার বেগে নামতে লাগলো সর্পিল পথ বেয়ে, দুইপাশে বুক সমান উঁচু সরিষাক্ষেতের মাতানো সুগন্ধ নাকে গুঁজে দিয়ে। আমি মুহূর্তেই আমার গ্রামের হেমন্তের কোনো সকালে ফিরে গেলাম টুক করে।

গত সপ্তাহান্তে তীরুদা'র হঠাৎ নিমন্ত্রণে চলেও যাই হঠাৎ। সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে সকাল সকাল পৌঁছানোর চেষ্টা করেও সেই তিপ্পান্ন সালের বদভ্যাস বশতঃ পৌঁছাই নির্ধারিত সময়ের দশ মিনিট পর। বদ্দা সুমন চৌধুরীকে চিনি আগে থেকেই, হিমু নামের কালবালিশ (কোলবালিশ না জনাব)কে হয়তো দেখেছি কলেজে, কিন্তু মনে না থাকার সম্ভাবনা নিরানব্বই শতাংশ। তীরুদার সঙ্গে কখনো সাক্ষাত হয় নি, আর সচল মিষ্টভাষী শাহীন ভাই- এই প্রথমবার।

স্টেশন থেকে বদ্দাই এগিয়ে নিতে এলেন। বললেন বাকীরা কাছে কোথাও আছে। অনেকেই হয়তো প্রমাদ গুণে রেখেছিলেন হিমু আর ধুসর এক জায়গায় হলে সেখানে কুরুক্ষেত্র হয়ে যাবে বিয়ে নামক জিনিষের কিছু 'বাইপ্রোডাক্ট'কে কেন্দ্র করে। বদ্দাও হয়তো ধারণা করেছিলেন তাই-ই। ক্যাফেতে বসে থাকা তিনজনের মধ্যে তীরুদাকে সনাক্ত করা যায় খুব সহজেই। বাকী থাকলেন শাহীন ভাই আর আমাদের হিমু। হিমুকেও না চেনার কোনো কারণ নেই। ঝলমলে রৌদ্দূরে এক পশলা কয়লার বস্তা দেখলেই জনগণ মনে করতে পারেন ওটা হিমু, এতে হিমু'র সেন্টু খাওয়ারও কিছু নেই আর জনগণেরও ঈদের খুশিতে কোলাকুলি করার কিছু নেই। বদ্দার উদ্বেগকে ভুল প্রমাণিত করে বসলাম হিমুর পাশেই। হিমুও অত্যন্ত আতিথেয়তায় বরণ করলো আমাকে। আফটার অল দোস্ত মানুষতো!

এর পরের ঘটনা গুলোর বর্ণনা অবশ্য ভুলবাল হলেও কিছুমিছু উঠে এসেছে হিমুর ফিকশনে। তবে হিমু যে কথাটি বলতে ভুলে গেছে তা হলো আমাদের বনাগমনের অধ্যায়টা। কোথাও হাঁটতে যাওয়া বলে কাছেই একটা বনে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো আমাদের। ওখানে আমি আর হিমু একবার পাশাপাশি হাঁটছিলাম। হিমু বলে, দোস্ত এখন হাগতে পারলে ভালো লাগতো রে! আমি বলি, ঠিক। ওপেন এয়ার কনসার্ট!
হিমু অবশ্য শুয়ে শুয়ে হাগার কথা বলে। আমি শরীয়তে মানা আছে বলে গাছের ডালায় বসে হাগার প্রস্তাব দেই। ব্যাটা রাজী হয় না। আমাকে "এক চাপে হাগা, তার কলাকৌশল এবং তার উপকারিতা" নিয়ে পৌণে দশ মিনিটের একটা লেকচার দেয়। আমি বেকুবের মতো তব্দা লেগে শুনি। হাগেন আলোচনা আর বেশিদূর যায় না বদ্দার চলে আসাতে। হাজার হোক মুরুব্বি মানুষ তো!

হিমু তার পার্বত্য চট্টগ্রামের ট্র্যাকিং-এ ঘটে যাওয়া ঘটনার বেশ রোমহর্ষক বর্ণনা শোনায় আমাকে। বাঙালীরা কীভাবে পাহাড়ীদের শোষণ করছে তার একটা ধারনা পাই টার কাছ থেকে।

বান্দরবানে হানিমুন করার আশা ব্যক্ত করি তার কাছে। শুনে হিমু ঠোঁট কুঞ্চিত করে হাসে। আমি বুঝিনা এর মানে কী দাঁড়ায়।

: তুই যা ব্যাটা ঐখানে, তারপর টের পাবি হিমু কী চিজ!

অথবা-

: ডরাইস না দোস্ত। আমি তো থাকুমই তোর লগে। তোর আর ডর কী!

আমি মনে মনে ভাবি, না অন্য কিছুকে ডরাই না। আমার যতো ডর তোরে নিয়াই শালা!!

Thursday, April 10, 2008

গুরুচন্ডালী - ০০৫

ঘরে ঢুকে পিসি'র দিকে তাকাতেই দেখি এভিজি তার ছেলেপুলে, নাতিপুতি সহ আমার পেয়ারের ডেলের ওপর খবরদারী করছে। কপাট ভেঙে তার প্রতিটা ঘরে ঘরে হানা দিচ্ছে কী সব আবোল তাবোল সন্দেহজনক হামলাকারীর খোঁজে। পাশে তাকিয়ে দেখি দাঁত কেলিয়ে বিজয়ীর হাসি হাসছে হুকুমের আসামী, এক্ষেত্রে স্বরাস্ট্রমন্ত্রী আমারি স্বনামধন্য ছোট ভাই। ওর হাসি দেখেই আমার ভেতরটা মোচর দিয়ে উঠলো! বুঝলাম ঘটনা খারাপ, শুধু খারাপই না- বেজায় খারাপ।

হাজার চারেক সন্দেহজনক হামলাকারী খুঁজে বের করে দিয়ে যখন এভিজি সাহেব বিদেয় নিলেন, তখন ডাক পড়লো আমার। কারণটা আগেই আন্দাজ করা ছিলো। বেচারা কম্পু স্টার্ট হতে নাকি অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। ঘুরে ফিরে খালি ওয়েলকাম স্ক্রীণে চলে যায়। আমি অবশ্য আমার ডাক পড়ার আগেই হাতুরি-বাঁটাল নিয়ে রেডি হয়ে ছিলাম। ডাক পড়াটা কেবল সময়ের দাবী ছিলো মাত্র! ঘটনা নতুন না তো। এই যেমন নয়া নতুন সনি'র পি-টু হান্ড্রেড কিনে দেয়ার মাস খানেকের মধ্যে ফ্ল্যাশ গন। তারও আগে আমার স্বাধের তোশিবা স্যাটেলাইট সিরিজের কপালেও ভালো কিছু জোটেনি, পিলিপস এমপিথ্রি প্লেয়ার, গেলো তার কন্ট্রোল নষ্ট হয়ে, একটা ডেস্কটপ পড়ে আছে টেবিলের কোণায়, এগুলো অবশ্য কোনোটাই বেচারা ছোটভাইয়ের দোষ না। জিনিষ গুলোই হঠাৎ মানুষের মতো আচরণ করে বিগড়ে বসলো। সেই ধারাবাহিকতায় এই ব্যাটা ডেল ইন্সপাইরন যে গত কয়েকটা মাস কী করে সার্ভাইভ করলো সেটাই অষ্টম আশ্চর্য আমার কাছে।

রাতে ঘরে ফিরে চালিয়ে দিলাম এক্সপি। উদ্দেশ্য এভিজি মিয়া যা যা সাফা করে দিয়েছে, সেই চোর ছেচ্চরগুলোকে লাল কার্পেট সম্বর্ধণা দিয়ে ফেরৎ আনা। দুই নাম্বার উইন্ডোজে এক নাম্বার লেটেস্ট ব্রাউজার আর মিডিয়া প্লেয়ার ব্যবহার করতে গিয়ে অনেক কিছুই করতে হয়েছে দারোয়ানের চোখ ফাঁকি দিয়ে। যাইহোক, ভাগ্য অতীব সুপ্রসন্ন হলে নাকি অতলান্তিকেও চর দেখা দেয়। আমার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো না। ঊনচল্লিশ মিনিট রিমেইনিং নামক সাইনবোর্ডটা দীর্ঘ দু'ঘন্টা ধরে মনিটর জুড়ে ঝুলানো দেখে বুঝলাম কাজ হবে না। এরে ধরি, ও ভাই তোমার এক্সপি আছে? উত্তর আসে, পিসিই নাই- এক্সপি দিয়া কী করুম? আরেকজনরে জিজ্ঞেস করি, ভাব নিয়ে উত্তর দেয় ভিসতা ইউজ করি! আমি পড়লাম না মহা গ্যাড়াকলে!

অবশেষে, ৩২ বিটের প্রসেসর আর ৫১২ র‌‌্যাম নিয়ে একটা রিস্ক নিয়েই ফেললাম। দিলাম ভিসতার হোম এডিশন ঢুকিয়ে শালার ভেতরে। এই ভিসতা যোগার হলো এখ বিরাট ইতিহাস নিয়ে। সংক্ষেপে বলে রাখি, পুরা ফাঁকতালে পাইছি, তাও জেনুইন। একেবারে সাইনবোর্ড টানানো।

এখন, পিসিতো দুইদিন পর স্টার্ট করা গেলো কিন্তু নেটে আর ঢুকা যায় না। ঐ দিকে সাদাত অমিত তারেক লাঠি নিয়ে স্বপ্নে তাড়া করে! ডরের চোটে না ঘুমিয়ে রাত কাটাই। নেটে যাওয়াটা ফরযে ক্বেফায়া হয়ে দাড়ায়। এক্সপি'র নেটগীয়ার ভিসতায় কাজ করে না। যাদের নেট ব্যবহার করি, শালারা চৌদ্দটা থেকে বিশটা পর্যন্ত দপ্তর খোলা রাখে। চৌদ্দটা বাজতে বাজতে আমার নিজের ধৈর্য্য ঘড়ির ব্যাটারী শেষ হওয়ার পথে। সলুশন পেলাম, আমার ইমেইল একটা লিংক পাঠানো হলো। সেখান থেকে ড্রাইভার ইনস্টল করে নিলেই হলো। আমি হাসলাম। যে আমি গত আড়াই দিন ধরে নেট সেবা পাইনা তার কাছে পাঠানো হয়েছে ইমেইল, 'ব্যাটা ইতর কোথাকার'। ইতর কথাটার মানে না বুঝে ব্যাটা বলে, "ভি বিটে!" আমি বলি কিছু না, ডাংকে।

কিচেনে গিয়ে আমার সিগারেট মেইট চান্দুকে জিজ্ঞেস করলাম নেট আছে কী না। কয় কাজ করে না। সুন্দরী আনিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম খালি মেইল চেক করবো! ছেমরি কয়, "জেয়ার টয়ার!" আমি কই, যা ফোট, মুড়ি খাগা গিয়া!

ড্রাইভার ইনস্টলড হলো। শত্তুরের মুখে পুরা ছাইয়ের স্তুপ ছড়িয়ে দিয়ে আমার নেট আবার আগের অবস্থানে ফিরে এলো। কিন্তু ঝামেলা বাধালো বত্রিশ বিট। একটা ব্রাউজার খুললেই হার্ডড্রাইভের বাতি আর নিভে না। ভাবে মনে হয় এই ব্যাটা টুয়েন্টিফোর-সেভেন সার্ভিস দেবার জন্য জানপ্রাণ! কী আর করা, এক ক্লিক করে আধা ঘন্টার একটা ঘুম দিয়ে উঠে তারপর ক্লিকের ফলাফল দেখতে পারি। মন্দ না। যাত্রা দেখার সাথে কলা বেঁচাও হয়ে যাচ্ছে আমার।

আমার স্কুল বেলায় সারাংশ লিখনে ফাঁকিবাজি এখন টেরপাই হাতেনাতে। পিসি খারাপ হইলো, এই ঘটনা লিখতে গিয়ে পুরা এক মহাকাব্য লিখে ফেললাম। এখন আমি সেই ঘটনাটা লেখি কেমনে? আরে ঐ যে সেদিন ট্রেনে কানে মোবাইলের তার ঠেসে ধরে গান শুনছিলাম যে। তারপর যে একটা কল এলো, আমার মোবাইলে সারাক্ষণই বীপ করা থাকে। সাধারণত কেউ বুঝেনা আমার কল এসেছে। এবারো তাই হলো। আমি বাইরের কন্ট্রোল থেকে রিসিভ করে কথা বলছি। ঠিক সামনে বসেছিলো দজন শুলারিন। একজন আবার দেখতে সেইরম। (আমি যে কেন শুলার হৈলাম না, আফসোস লাগে ) আমি যখন কথা শুরু করলাম ফোনে, সেইরম চেহারাধারী শুলারিন ললনার চোখের সঙ্গে টু টাইমস নাইনটি ডিগ্রী এঙ্গেল। ললনা আমাকে জিজ্ঞেস করে তাকে কিছু বলছি কিনা। আমি কোনো শব্দ না করে, তার দিকে তাকিয়ে ফোনে কথা চালিয়ে যাই। মেয়েটা জবাব দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ভাষাগত অর্থোদ্ধারে ব্যর্থ হয়ে ক্ষ্যান্ত দেয়। এবার আমি আস্তে করে মাথা ঝাঁকিয়ে ঠোঁট নেড়ে বুঝাই তোমাকে না, মোবাইলে কথা বলি। মেয়েটা হাসিতে ভেঙে পড়ে, মদন হওয়ার আনন্দে। দুজনেই হাসে। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। ফোনে কথা শেষ করে, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আমিও হাসি। ওদের মতো না। আমার মতো। তা দেখে তারাও হাসে। আমি খুশী হই। যাত্রা ভালো লাগে। কিন্তু সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। নেমে যায় সুন্দর সেই ললনা। আমি আবারও বিষাদে ডুবে যাই। নীল নয়নার ফাঁদে অল্পের জন্য পড়া হলোনা বলে আফসোস হয় বাকিটা পথ!

Friday, March 14, 2008

গুরুচন্ডালী - ০০৪

: আলেস ক্লা আন্নে?

: ইয়া... আলেস গুটে। দু বিস্ত জেয়ার ডুন গেভোর্ডেন!

মৎস্য আর ঘাস পাতার ওপর গাঁইতি চালিয়ে, বুকের দুরফুর কমানোর লক্ষ্যে গরু খাওয়া বেশ কিছুদিন বন্ধ ছিলো। আল্টস্টাডে ডরোথীন স্ট্রাসের মুস্তাফার দোকানে তাই হানাও দেয়া হয়নি এই মাসখানেক। কাল বিকেলে কারস্টাডের উপরের তলার ক্যাফেটেরিয়াতে উইণ্ডো সীটে বৃষ্টিস্নাত শহরের বিষণ্ণতায় এক গ্লাস আমরস গলাধঃকরণ করেই এলোমেলো পদক্ষেপে পুরাতন শহরের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। মাসখানেকের বিরতির পর গরুর হাম্বা ডাক আমাকে খুব নস্টালজিক করে দিচ্ছিলো। বৃহষ্পতিবার মুস্তাফা ফ্রেশ গোশত দোকানে তোলে। দেখিই না গিয়ে কী হয়!

মুস্তাফার মা। ষাটোর্ধ তুর্কিশ মহিলা। দাঁতহীন বুড়ো মানুষের মতো কথা বলেন। খুব ভালো জার্মান হয়তো বলেন না, কিন্তু কথা বলেন খুব মায়া করে। তুর্কী আন্নে মানে হলো, মা। আমি দোকানে ঢুকেই ভদ্রমহিলাকে ঐভাবে সম্বোধন করি। কুশল জিজ্ঞেস করি। ভদ্রমহিলা অনেক খুশী হোন।

মুস্তাফা সুন্দর, ভালো, তরতাজা দেখে গোশত নিয়ে কেটে কুটে কয়েকটা ঠোঙা করে দেয়। ও ভালো করেই জানে, ওসব কাটাকুটি আমাকে দিয়ে হয় না, নিজেই সব রেডি করে দিয়ে বলে, "নাও, এবার শুধু হাঁড়িতে তোলা বাকী!"

আমি শত-কোটি ধন্যবাদ দিয়ে ব্যাগটা হাতে ঝুলিয়ে তড়িঘড়ি করে রাস্তায় নেমে আসি। ঠিক পরক্ষণেই হৃদয়ের উষ্ণ ছোঁয়াটুকু ভুলে যাই। ট্রাম ধরার চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। এবং দ্রুত পা চালাই, ট্রামটা মিস হলে আরও পাঁচটা মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হবে!

কাউফহফে দেখা হয়ে যায় নাদিয়া'র সঙ্গে। ম্যানস্ সেকশনে কাজ করে। ঘুরতে ঘুরতে একসময় খেয়াল করি কেউ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চশমা না থাকায় ঠাহর করতে পারি না ঠিক। খুব ধীরে সেদিকে এগোই একটা-দুটো শার্ট-গ্যাঞ্জি নেড়ে নেড়ে। কাছে যেতেই নাদিয়া হাউমাউ করে ওঠে।

"মাই গট। তোমার একী হাল! কি এতো টেনশন করো! ম্যান তোমাকে চেনাই যায় না। তুমি কি ঠিক আছো?"

নাদিয়াকে আশ্বস্ত করি। আমি ঠিকই আছি। শুধু স্ট্রেসের পরিমানটা বেড়েছে। নিজের প্রতি যত্ন বলতে যা বুঝায়, ওটাতে সামান্য ঘাটতি হচ্ছে বটে! সেটা ঠিকমতো হলেই আবার ফুলে ফেঁপে ওঠা যাবে, ব্যাপার না।

কিছু সময় কাটলো নানা আলাপে। নাদিয়া দৌঁড়ে গেলো ক্যাশে ডাক পরেছে বলে। আমি পাশ কাটিয়ে এসকেলেটর ধরে সোজা নিচের ফ্লোরে। নাদিয়ার জন্য আর অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করে না।

কাউফহফ থেকে যখন বেরুলাম তখন আকাশে চালুনীর মতো ফুঁটো। চালের গুঁড়ি যেমন খুব সূ্ক্ষ হয়ে পরে, তেমনি বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে- পটপটকটকট! বেথোফেনের মূর্তির পাশ দিয়ে স্টারবাকস, পিৎজা হাট ছাড়িয়ে ফ্রিডেন প্লাৎস। ডিএম-এ ঢুকতে হবে। কিছু দরকারী জিনিষ না কিনলেই না। অযথাই কয়েকটা পাক ঘুরে তিনটা মাত্র জিনিষ হাতে ধরে চেকআউটে বিল মিটিয়ে বের হবার পথেই ঝপাৎ করে নেমে গেলো। অনেকের মতো ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করলোনা বলেই সোজা হাঁটা দিলাম মার্কটপ্লাৎসের দিকে। ওখান থেকে ক্যাফে গোয়েটলিশ, বুভিয়ের, কার্টহাউজ পেরিয়ে বহুমূখি বাস স্ট্যান্ড।

লাইনের বাস এলো পনেরো মিনিট পর। উঠলাম। দাঁড়ানোরও জায়গা নেই। সামনের দিকে কোনমতে নিজের ভারসাম্য রক্ষা হয় এমন একটা জায়গায় ঠেস দিলাম। পাশের সীটেই এক বয়স্ক মহিলা তার কুকুর নিয়ে বসে আছেন। ভাবছি, কুকুরটা যদি আমাকে কামড়ে দেয়, তাহলে!

আমার ঠিক সামনে নব্বই ডিগ্রী কৌণিক ভঙিতে দাঁড়িয়ে আছে এক ললনা। খুব সম্ভবত পোলিশ হবে। শরীরের গঠনে তাই মনে হয়। তার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে না।

আমার এখন জানালার কাঁচে এঁকেবেঁকে বৃষ্টির গড়িয়ে পড়া পানি দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। কিন্তু সমস্যা হলো জানালাটা দেখতে হলে ললনাটির ঠোঁট সমান উচ্চতায় আমাকে তাকাতে হয়। বাদ দিলাম। কারণ, আমার বাম পাশের যে ভদ্রলোক আছেন তিনি মনে করছেন আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ললনাটিকে দেখছি। তার দিকে না তাকিয়েও আমার দিকে তার দৃষ্টি বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছিলো আমাকে।

Saturday, February 23, 2008

গুরুচন্ডালী - ০০৩

গত কয়েক বছর ধরে একুশে ফেব্রুয়ারী আমার মনে থাকে অন্য আরেকটা কারণে।নিরানব্বই এর একুশে ফেব্রুয়ারী একটা বৌভাত হয়ে ফিরছিলাম। পরের দিন বৃটিশ কাউন্সিলে আংরেজী পরীক্ষা সিস্টেম আয়ত্বের নিরস জিনিষ গিলতে হবে বিরস বদনে, সরস জেনি'র পাশে বসে!
আজকে ঘুম ভেঙেছে দেখে ছোট ভাই জিজ্ঞেস করলো দিনটা মনে আছে কি না! অনেক ভেবেও মনে করতে পারিনি আজকের দিনটার শানে নুযুল কী!

মেসেঞ্জারে পরিচিত একজনের সঙ্গে কথা হচ্ছিলো। কথার কথা বলতে কেবল প্যাচানি আর খোঁচানি। এই হাওয়াসন্তানের সঙ্গে প্রথম সাহস করে দেখা করতে যাই হিলসডেইল, বুকে বিশাল সাহস সঞ্চয় করে। অষুধের দোকানে ঢুকে দেখেই বুঝতে পারি কোনটা সে! সঞ্চিত সাহস ফুরুৎ করে সব বেরিয়ে গেলে বুঝতে পারি কথা বলার শক্তিও খুইয়েছে শরীর। কোনো রকমে পাশে সরে এসে বরফঠান্ডা ফাউন্টেন থেকে ঢকঢক করে কয়েক গেলাস শীতল পানি গিলি। সেদিনটাকে ক্যালেন্ডারে কোথাও ফেললে সেটা দেখাবে ফেব্রুয়ারীর ২২ তারিখেরই আশে পাশে কোথাও। কিন্তু সেটাও পূর্বোক্ত ঘটনায় ধর্তব্য না।

বারউড স্কুলের বৈশাখী মেলায় বটগাছের তলে লাল পাড়- সাদা জমিনের শাড়িতে পুতুল পুতুল মুখ করে দাঁড়িয়ে দরদর করে ঘামতে দেখেছি। হাতে টিস্যু নিয়ে সামনে ধরে দাঁড়ানো হয় নি। ফেব্রুয়ারীর সাহসের অভাবটা এখানেও অনুভূত হয়েছিলো আগুনভাবে। এখনো চোখের সামনে থেকে বটগাছের ছায়ায় দাঁড়ানো সে মূর্তিটা সরে না!

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA


একটা গানের জন্য ঘ্যানর ঘ্যানর করছে সেই কখন থেকে, ব্রেক দিয়ে দিয়ে। শর্ত জুড়ে দিয়েছি বলে গোল টেবিলে বসে নেগোসিয়েশন করছে। একেকটা বার্তায় যখন চোখের ডান কোণের কিছুটা জায়গা হলদে হয়ে ওঠে, কানের কাছে মাউথ অর্গানটা যখন বেজে ওঠে, তখন আমিও ২২ ফেব্রুয়ারীর কারণটা তালাশ করতে একবার বৌ-ভাত, একবার ঢাকা, একবার হিলসডেইলের সেই ওষুধের দোকান আরেকবার মেলা মাঠের সেই বটগাছটার নিচে চলে যাই- এক দৌঁড়ে!

Tuesday, February 19, 2008

গুরুচন্ডালী - ০০২

বিভূঁইয়ে পাঞ্জাবি পরার হ্যাপা অনেক। উপলক্ষই পাওয়া দুষ্কর পাঞ্জাবি পরিধানের। আবার উপলক্ষ পেলেও আবহাওয়া লক্ষ্য করা মস্ত এক ফ্যাক্টর। ঝলমলে, গনগনে দিন হলে কোন কথা নেই, কিন্তু যদি হয় মাঘ মাসের কোন একটা সময়ে! তাহলে শীতে বাঘ তাড়াতে তাড়াতে ভানু সাহেব তার দুইখান কথা না বলে থাকতেই পারবেন না!

পুজার দাওয়াত ছিলো অনেক আগে থেকেই। ভুলেও গিয়েছিলাম। হঠাৎই একজন জানালো যাবো কীনা। আমি পারতঃপক্ষে এড়িয়ে চলতে চাই, কিন্তু এবার পাঞ্জাবি পরার লোভের পাশাপাশি আরেকটা জরুরী তাগিদে যেতে হলো বৈকি! ঘটনাটা খুলেই বলি তাহলে-

ছোটভাই দেশ থেকে আসার পর থেকেই কেমন মনমরা থাকে। চাপা স্বভাবের মানুষ, প্রকাশ না করলেও ঠিকই বুঝি দেশ থেকে আসার পরের সিনড্রোমে ভুগছে। খুব খারাপ জিনিষ এটা। চান্স পেলেই বাড়ির গল্প করছে, ঢাকায় ল্যান্ডিং থেকে ফিরতি ফ্লাইটে ওঠার আগ পর্যন্ত সব ঘটনার পুংখানুপুঙ্খ বয়ান করে ফেলছে সুযোগটি পেলেই। মা বলছিলো, আসার আগে নাকি অন্যবাড়ি গিয়ে কেঁদেছে পাছে মা আসতে দিবে না এই ভয়ে। আমাকে ক্ষণে ক্ষনেই তাগাড়া দিচ্ছে দেশে চলে যেতে।

যাইহোক, তার বাংলাদেশ ভ্রমন পরবর্তী সিনড্রোম কাটাতেই পুজোতে যাওয়া। পুজো তো না ঠিক, পুজোর অনুষ্ঠান। আমি যেতেই দেখা-সাক্ষাত-কোলাকোলি শেষে লুচি খাওয়ার আমন্ত্রন। 'তোমার ভাই এসেছে শুনলাম...'- কয়েকজনের সপ্রতিভ জিজ্ঞাসা। কৌতূহল মেটাই অঙুলি যথাস্থানে নির্দেশ করে। ভাবীরা খাওয়া তুলে দিলো, আমার স্বাস্থ্যের অবনতির কথা মনে করিয়ে দিলো, অনেকদিন বাদে দেখা- খানিক হাপিত্যেশ হলো। এবং অবশেষে পেটপুরে ডাল-সব্জি দিয়ে অগুণতি লুচি খাওয়া হলো।

এবার গানাবাজনা হলো। পেছনে দাঁড়িয়ে যতো রকম দুষ্টামী করা যায় করা হচ্ছিলো। সামনে বসা আধা-বাঙালী তিনজন ললনার সঙ্গেও চোখাচোখি হলো, ড্যাম কেয়ার ভাব দেখানো হলো (ছোট ভাই আছে যে সাথে, তাছাড়া আজকে মিশনতো ভিন্ন!), দল বেঁধে বাইরে গিয়ে বিড়ি ফুঁকা হলো, এবং অবশেষে ফেরার পথ ধরা হলো।

একজন কোথাও বসে সময়ক্ষেপণের আহবান জানালো। এবারো রাজী হলাম ছোট ভাইয়ের জন্যই। নির্ধারণ হলো বায়ার্ণের 'সালভাটোরে'। ভালো লাগার মতো একটা জায়গা। যারা বায়ার্ণ দেখেনি তারা অন্তত ঐ ছোট্ট জায়গাটুকুতে বায়ার্ণের আমেজ এবং আবেশ দুই'ই পেতে পারে। বিরাট লিটার মগে এক্সপোর্ট বীয়ার, নানা সাইজের 'পাওলানার'-র গেলাস, বিশাল স্ক্রীণে ফুটবল খেলা, বায়ার্ণের স্কাল্পচারাল ভিউয়ের একপাশে জার্মানীর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সালভাটোরে পরিভ্রমন এবং ভালোলাগার মানপত্র, পরিবেশ সব মিলিয়ে চমৎকার একটা জায়গা সময় কাটানোর। ওখানে বসেও বোধ করি বেচারা ছোট ভাই দেশের অলিতে গলিতেই ঘুরে বেরিয়েছে।

বাংলাদেশ ভ্রমনোত্তর এই সিন্ড্রোম কাটাতে খুব শীঘ্রই তার প্রিয় সুইজারল্যান্ডে একটা ট্যুর করা যায় কিনা ভাবছি। আবার এটাও ভাবি পাশের দেশ হল্যান্ডে গেলেও ভালো। ফুলের দেশ, মন ফুরফুরে হবে নিশ্চই, যদিনা জটিল কোন প্রেম রোগ থেকে থাকে। আর আমারও অনেক দিন হলো, হল্যান্ডের ফ্রেশ গঞ্জিকা সেবন করা হয় না।

Sunday, February 17, 2008

গুরুচন্ডালী - ০০১

বাতি নিভে যাবার আগে যেমন দপ করে জ্বলে ওঠে, তেমনি করে এবারের শীত গত কয়েকদিন ধরে চামড়া, মাংস ভেদ করে সোজা হাড়ে গিয়ে কামড়টা বসাচ্ছে। এটা এমন বিশেষ কিছু না। প্রতিবছরই কিছু না কিছু তুষারপাত হয়, এবার তুষারের দেখা মেলেনি। মাঝ-ফেব্রুয়ারীতে শীতের কামড়টা সামান্য অশ্লীলই হবে, এ আর এমন কী!

একাধারে অনেকক্ষণ একই জিনিষ দেখা কিঞ্চিৎ একঘেয়ে বটে! টানটান উত্তেজনায় ভরা ইংরেজী কোন ছবি হলে সেটা মেনে নেয়া যায় দৈর্ঘ্যের কথা বিবেচনায়। কিন্তু এক্ষেত্রে হিন্দি ছবি প্রায়ই মার খেয়ে যায় আমার কাছে। তিন ঘন্টায় কম করে হলেও সাড়ে পাঁচবার বিরতি নেয়া হয়। 'ইদানিং বাংলা ছবি দেখি'- একথা শুনলে জনগণ তেড়ে আসবেন মেরে ঠান্ডা করে দেবার আশায়, তাই না হয় উহ্যই রাখলাম আমার বাংলা সিনেমাপ্রেম! আর বিয়ের ভিডিও? টেনেটুনে, ফরোয়ার্ড-রিওয়াইন্ড করে কখনোই বোধকরি সিকি ভাগের কোটা ছাড়াতে পারিনি। ব্যতিক্রম ঘটিয়ে দিলো ভাইয়ের বিয়ের ভিডিওটা। এখন পর্যন্ত সোয়া দুইবার দেখা হয়ে গেছে কী না!

একটু ট্রেলার দিই বরং, কী আছে সেখানে।

আমার মা। ভিডিও ক্যামেরার সামনে যাকে মনে হয়েছে পুরা রোবোকপ। হাতে নানা জিনিষ, কণের বাড়ি যাচ্ছেন, জিনিষ বুঝিয়ে দিচ্ছেন, ঘর থেকে বের হয়েছেন, চলাফেরা করছেন- কিন্তু মুখ একদম বন্ধ আর চোখ? সটান খোলা। নো পলক, নো নড়ানড়ি! বেচারী, এতো পছন্দের পান মুখ ভর্তি করে রেখেও সেটা চিবাতে পারছেন না ক্যামেরাম্যানের ভয়ে!

আমার বাবা। সবচাইতে যার ভিডিও তথা ছবি কম উঠেছে তিনি এই ব্যক্তি। হ্যালীর ধূমকেতুর মতো হঠাৎ নজরে এসে যাওয়া মোবাইল হাতে বাবাকে দেখে ছোট ভাইকে জিজ্ঞেস করতে ভাই জানালো, এটা আব্বার নতুন বাতিক! কারণে অকারণে মোবাইল টেপাটেপি করা। মা এজন্য মহা বিরক্ত। আমি হাসি আর ভাবি, মা'র বিরক্তির কারণই তাহলে বাবার এই বাতিকের পেছনের কারণ!

ভাইয়া। বিয়েটা তারই। বেচারাকে দেখে মনেহয় পুরা পেরেশানীতে পড়ে গেছে। কয়েক জায়গায় দেখলাম খালি চড়কীর মতো ঘুরছে। কণের গায়ে হলুদে যাবার গাড়ি বহরের পাশে এক সুদর্শন যুবক কে দেখে ছোট ভাইকে যেই বললাম, বাহ্ ড্রাইভারটা তো বেশ স্মার্ট। অমনি ছোটভাই হায় হায় করে বলে, আরে ড্রাইভার দেখলা কই? এটাতো ব-বে! (মানে বড় ভাই)

ছোটভাই। হ্যাঁ এ হলো সেই যার জন্মদিনে আপনারা শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন অনেকেই। খুব খুশী হয়েছিলো সেদিন। সবাইকে ফিরতি ধন্যবাদ জানিয়েছে অকাতরে। বিয়েতে মধ্যমণি ছিলো সে-ই। সারা ভিডিও জুড়ে মনে হলো কেবল তাকেই ক্যামেরাম্যান শ্যুট করেছে। একবার কোয়ার্টার প্যান্ট আর কালো টিশার্ট পরে মানির বোতল টানে তো পরের শটে দেখা যায় ভীষণ মাঞ্জা মেরে মেহমান বরণ করছে। ঠিক তার পরের শটেই দেখা যায় কাকে হাত নেড়েনেড়ে কি ডিকটেশন দিচ্ছে। সারাক্ষণই হাসে ব্যাটা। চশমার ভেতর দিয়ে পিটপিট করে তাকায় আর দাঁত বের করে হাসে। হাতে ২৬টা দিন নিয়ে সব কিছু সূচারু ভাবেই সম্পন্ন করে এসেছে, বুঝা যায়। সবার শেষে ভাইয়াকে হলুদ দিতে স্টেজে যেতেই দেখলাম দুজনে পালা করে কেঁদে দিলো। ভাইয়ার কপালে হলুদ ছোঁয়াতেই ভাইয়া কেঁপে উঠে টিস্যুতে চোখ মুছে আর এটা দেখে ছোটভাই সারা শরীর কাঁপিয়ে দুহাতে চোখ ঢেকে স্টেজ থেকে পালালো। ঘটনার আকষ্মিকতায় আমার দৃষ্টিও খানিকটা ঝাপ্সা মনে হলো। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি কাঁদিনি। কাঁদার মতো এতো নরম আমি মোটেও না।

আমার ভাবী। আমাদের পরিবারে নতুন সংযোজন। পরিবারের সদস্যসংখ্যা পাঁচ থেকে ছয়ে উন্নীত করতে তার ভূমিকা অনেক। যেহেতু তাকে এখনো দেখিনি, তাই তাকে নিয়ে এখনি কিছু লিখছিনা। তুলে রাখলাম পরের বারের জন্য। তবে ফোনে যতটুকু বুঝলাম, আমাদের পরিবারের পারফেক্ট মেম্বার! 'মা তোমাকে অনেক মিস করে। মা'কে কাঁদাতে ভালো লাগে তোমার?' - আমাকে ছুঁড়ে দেয়া প্রশ্নটি ছিলো তার!